যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী কে এই অ্যান্ডি বার্নহাম

ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় সাবেক মেয়র ও যুক্তরাজ্যের পরবর্তী সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম । ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণার পর ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভেতরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন অ্যান্ডি বার্নহাম। ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় সাবেক মেয়র, ব্রিটেনের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং লেবার পার্টির মধ্য-বাম ধারার এই নেতা এখন যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। একক প্রার্থী হলে তিনি খুব দ্রুতই ডাউনিং স্ট্রিটে পৌঁছে যেতে পারেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন শুধু ব্রিটিশ রাজনীতির বিষয় নয়। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ছয় লাখের বেশি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের ভবিষ্যৎ, শিক্ষার্থী ও শ্রম অভিবাসনের নিয়ম, রেমিট্যান্স প্রবাহ, বাণিজ্য সম্পর্ক এবং বিদেশে থাকা সন্দেহভাজন সম্পদ ফেরত আনার কূটনৈতিক উদ্যোগ—সবকিছুর সঙ্গেই এই নেতৃত্ব পরিবর্তন যুক্ত। ফলে বার্নহাম কে, তার রাজনৈতিক অবস্থান কী এবং অভিবাসন বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি কতটা কঠোর বা মানবিক—এসব প্রশ্ন এখন ঢাকা থেকে লন্ডন পর্যন্ত বাংলাদেশি সমাজে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
কে এই অ্যান্ডি বার্নহাম
অ্যান্ডি বার্নহাম ব্রিটিশ রাজনীতির একটি সুপরিচিত নাম। তিনি ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত লেবার পার্টির সংসদ সদস্য ছিলেন। গর্ডন ব্রাউনের সরকারের সময় তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিফ সেক্রেটারি, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও ক্রীড়া মন্ত্রী এবং পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৭ সালে তিনি গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র নির্বাচিত হন এবং ২০২১ ও ২০২৪ সালে বিপুল ভোটে পুনর্নির্বাচিত হন। স্থানীয় সরকার, পরিবহন ব্যবস্থা, আবাসন সংকট মোকাবিলা, গৃহহীনতা হ্রাস এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার কাজ তাকে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরুদ্ধে উত্তর ইংল্যান্ডের মানুষের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার কারণে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এরপর থেকেই তাকে অনেকেই ‘উত্তরের রাজা’ হিসেবে অভিহিত করতে শুরু করেন।
বার্নহামের রাজনৈতিক দর্শন: লন্ডন নয়, অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন
বার্নহামের রাজনীতির মূল ভিত্তি হলো যুক্তরাজ্যের ক্ষমতা ও উন্নয়নকে রাজধানী লন্ডনকেন্দ্রিক কাঠামো থেকে বের করে আনা। তিনি মনে করেন, অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
ম্যানচেস্টারে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একটি অংশ উত্তর ইংল্যান্ডে স্থানান্তরের প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেন, যাকে তিনি প্রতীকীভাবে ‘উত্তর দপ্তর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেছিলেন, উন্নয়ন ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না; এটি নিচ থেকে ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে হয়।
তার পরিকল্পনায় স্থানীয় সরকার, আঞ্চলিক প্রশাসন এবং মেয়রদের হাতে আরও ক্ষমতা দেওয়ার কথা রয়েছে। আবাসন, পরিবহন, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নীতিতে স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোকে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি লেবার পার্টির প্রচলিত সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক নীতির অনুসারী। উত্তর ইংল্যান্ডে পুনঃশিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসার তার প্রধান অগ্রাধিকার। তবে সমালোচকেরা বলছেন, তার অনেক পরিকল্পনার অর্থনৈতিক উৎস ও বাস্তবায়ন কৌশল এখনও স্পষ্ট নয়।
অভিবাসন নীতি: নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবতার সমন্বয়
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে বার্নহামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান হলো অভিবাসন নীতি। যুক্তরাজ্যে বর্তমানে অভিবাসন ইস্যু অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাজের ভিসা এবং স্বাস্থ্য ও কেয়ার সেক্টরের অভিবাসন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। রাজনৈতিক চাপের কারণে যুক্তরাজ্য সরকার অভিবাসন নীতিকে আরও কঠোর করেছে।
বার্নহামের অবস্থান সরাসরি সীমান্ত উন্মুক্ত করার পক্ষে নয়। তিনি অভিবাসনকে নিয়ন্ত্রণ, জনআস্থা এবং ন্যায্যতার বিষয় হিসেবে দেখেন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি সরকারের কঠোর অভিবাসন নীতির সঙ্গে আংশিকভাবে একমত হতে পারেন। এসব নীতির মধ্যে রয়েছে শরণার্থী মর্যাদার নিয়ম পরিবর্তন, স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা অর্জনের সময় বৃদ্ধি এবং আশ্রয় প্রক্রিয়ায় কঠোরতা।
রাজনৈতিক সূত্রের বক্তব্য, অভিবাসন বিষয়ে জনআস্থা তৈরি না হলে কোনো ইতিবাচক নীতিই কার্যকর হয় না।
এই অবস্থান একদিকে তাকে অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে, অন্যদিকে লেবার পার্টির উদারপন্থী অংশ ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও কর্মীদের জন্য পরিস্থিতি
বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও কর্মীদের জন্য বার্নহামের সম্ভাব্য সরকার তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো ছাড় দেবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
যুক্তরাজ্যের বর্তমান অভিবাসন কাঠামো ইতোমধ্যেই কঠোর। শিক্ষার্থী ভিসা, কাজের অনুমতি এবং ভিসা শেষে অবস্থানের নিয়ম আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
এর ফলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, কেয়ার কর্মী এবং দক্ষ কর্মীদের জন্য বৈধ কাগজপত্র, সঠিক স্পন্সরশিপ এবং নিয়ম মেনে চলা আগের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বার্নহাম অভিবাসীদের অবদান স্বীকার করলেও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে যুক্তরাজ্যের বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা এখনও সীমিত।
ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সমাজে বার্নহাম
যুক্তরাজ্যে প্রায় ছয় লাখের বেশি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষ বসবাস করেন। এর বড় অংশ লন্ডনে থাকলেও ম্যানচেস্টার, বার্মিংহাম, লুটন এবং ওল্ডহ্যামে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশি কমিউনিটি রয়েছে।
ম্যানচেস্টার অঞ্চলে বার্নহামের জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে বেশি। স্থানীয় সরকার ও পরিবহন ব্যবস্থায় তার সংস্কারমূলক উদ্যোগ অনেকের কাছে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত।
ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণ পেশাজীবী আশরিফ ইমন বলেছেন, স্থানীয় উন্নয়ন ও গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে বার্নহামের ভূমিকা প্রশংসনীয় হলেও অভিবাসন নীতিতে তার অবস্থান নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী নবীন আলী বলেছেন, উত্তর ইংল্যান্ডে বার্নহামের জনপ্রিয়তা থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে অভিবাসন নীতি আরও কঠোর হতে পারে—এমন আশঙ্কা আমাদের কমিউনিটির মধ্যে রয়েছে।
ঢাকা–লন্ডন সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা
যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদার। বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রবাসী আয় এবং উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।
গত শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত আনার বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে কিছু সন্দেহভাজন সম্পদ নিয়ে তদন্ত চলছে এবং কিছু সম্পদ ইতোমধ্যে জব্দ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও আইনি সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বার্নহামের সম্ভাব্য নেতৃত্ব বাংলাদেশের জন্য নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ কী আশা করতে পারে
বার্নহামকে শুধু দলীয় নেতা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। তিনি আঞ্চলিক ক্ষমতায়ন, জনসেবা এবং পুনঃশিল্পায়নকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতিনিধি।
তার অভিবাসন দৃষ্টিভঙ্গি মানবিক ভাষা ব্যবহার করলেও বাস্তবে তা নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ তিনটি: প্রথমত, শিক্ষার্থী ও কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নিয়মকানুন কঠোরভাবে মানা। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি। তৃতীয়ত, অর্থপাচার ও সম্পদ পুনরুদ্ধার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।
অ্যান্ডি বার্নহামের উত্থান তাই শুধু ব্রিটেনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের গল্প নয়। এটি যুক্তরাজ্যের ক্ষমতার কাঠামো, অভিবাসন নীতি, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং বাংলাদেশ–যুক্তরাজ্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার একটি সম্ভাব্য মোড়।
ডাউনিং স্ট্রিটে তার প্রবেশ ঘটলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থী, প্রবাসী এবং নীতিনির্ধারকদের সামনে নতুন প্রশ্ন দাঁড়াবে—নতুন ব্রিটেনে তাদের অবস্থান কোথায়?




