জনসমুদ্রে ‘ঘনঘটা’, নাচের ঢেউয়ে ভাসল চারুকলা

ছবি: আগামীর সময়
কথা ছিল একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভেজা হবে। সকাল থেকে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সেই বৃষ্টি আসেনি; তাই বৃষ্টিতে ভেজা না হলেও সুর আর নাচের ছন্দের এক অভূতপূর্ব জনসমুদ্রে ভাসল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলা। তিল ধারণের জায়গা ছিল না সেখানে।
একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার অর্থি আহমেদের উদ্যোগে এবং চারুকলা অনুষদের সহযোগিতায় আজ শুক্রবার সকালে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশেষ নৃত্যানুষ্ঠান ‘ঘনঘটা ২’। সকাল ১১টায় বকুলতলার ঐতিহ্যবাহী মঞ্চে বসে এই সুর ও নৃত্যের আসর।
প্রসঙ্গত, গত বছর অর্থি আহমেদকে যখন একুশে পদক দেওয়া হয়, তা নিয়ে হয়েছিল নানা সমালোচনা। নৃত্যশিল্পী অর্থি আহমেদ যেন আজ মঞ্চে তার নান্দনিক সৃজনশীলতার মধ্য দিয়েই সেই সমালোচনার মোক্ষম জবাব দিলেন। ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ গানে মঞ্চে যখন একঝাঁক তরুণ শিল্পী নাচ করছিলেন, তখন পুরো দর্শক সারিতেও যেন সেই নাচের ঢেউ খেলে যাচ্ছিল। শিল্পীদের ছন্দের দোলায় মেতে ওঠেন উপস্থিত হাজারো দর্শক।
এই আয়োজন কেবল বর্ষা উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অনুষ্ঠান থেকে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় তহবিলও সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান অর্থি আহমেদ।
প্রায় চার মাস আগে থেকেই এই উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। তবে দেশের সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতির পর আয়োজকেরা মনে করেছেন, এমন মানবিক দুর্যোগকে উপেক্ষা করা যায় না। অর্থি আহমেদ বলেছেন, ‘শিল্পী হিসেবে সমাজের প্রতি আমাদের একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। তাই বর্ষা উদযাপনের পাশাপাশি বন্যাকবলিত দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও চেষ্টা করছি আমরা।’
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অর্থি আহমেদ ড্যান্স একাডেমির সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে যেমন তহবিল সংগ্রহে অবদান রেখেছেন, তেমনি দর্শনার্থীরাও অনুষ্ঠানস্থলে স্থাপিত জাগো ফাউন্ডেশনের বুথের মাধ্যমে বন্যার্তদের জন্য মুক্তহস্তে অনুদান দিয়েছেন।
গেল সপ্তাহে এই অনুষ্ঠানের মহড়ার একটি ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার করে অর্থি আহমেদ বলেছিলেন, ‘এই আয়োজনে ছাতা আনতে মানা, কারণ ভিজবো একসাথে’। সেই আবেদনে সাড়া দিয়েই আজ চারুকলা প্রাঙ্গণে জড়ো হন হাজারো সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ।
অর্থি আহমেদের ভাষ্য, ‘নগরজীবনে বর্ষা এখন অনেকের কাছেই জলাবদ্ধতা ও যানজটের ভোগান্তি হয়ে উঠেছে। অথচ বাংলার সংস্কৃতিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বর্ষা আমাদের উৎসব ও প্রাণের অংশ। সেই সাংস্কৃতিক চেতনাকে নতুন প্রজন্মের সামনে আনতেই এই আয়োজন। মানুষ যেন শুধু বর্ষা উদযাপনই না করে, একই সঙ্গে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও সুযোগ পায়—আমরা মূলত এমন একটি মানবিক পরিসর তৈরি করতে চেয়েছি।’
৯০ মিনিটের এই বর্ণিল অনুষ্ঠানে মোট ১৬টি নাচ পরিবেশন করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং বাংলার লোকজ ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত এসব পরিবেশনায় অংশ নেন ৩ থেকে ৭০ বছর বয়সী প্রায় ৩০০ শিল্পী। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যেমন ছিল খুদে শিশু ও প্রথমবারের মতো মঞ্চে ওঠা নৃত্যশিল্পীরা, তেমনি ছিলেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক ও গৃহিণীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ।
গত বছরের প্রথম ‘ঘনঘটা’ অনুষ্ঠানের দারুণ সাড়াই এবার আরও বড় পরিসরে এই মানবিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনটি আয়োজন করতে অনুপ্রাণিত করেছে বলে জানান আয়োজকেরা।






