ব্রাজিলে ভোটগ্রহণ, লড়াই লুলা-ফ্লাভিওর
- ট্রাম্পের ছায়া, অপরাধ-দুর্নীতিতে ব্রাজিলের নির্বাচন

সংগৃহীত ছবি
দুর্নীতি কেলেঙ্কারি, গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ভোটারদের রাজনৈতিক ক্লান্তির মধ্যেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন ব্রাজিলের কোটি কোটি মানুষ। লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির এই নির্বাচনে মুখোমুখি হয়েছেন বর্তমান বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ও ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো, সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর জ্যেষ্ঠ ছেলে।
এই নির্বাচন শুধু ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিপথই নির্ধারণ করবে না, এর প্রভাব পড়তে পারে লাতিন আমেরিকার ভূরাজনীতিতেও। মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, ব্রাজিল কি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল ধারার দিকে ঝুঁকবে, নাকি লুলার বহুপক্ষীয় ও তুলনামূলক স্বতন্ত্র বৈদেশিক নীতির পথেই থাকবে।
৮০ বছর বয়সী লুলা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে ৪৫ বছরের ফ্লাভিও সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর জ্যেষ্ঠ ছেলে এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। ২০২২ সালের নির্বাচনের পর অভ্যুত্থানের চেষ্টার অভিযোগে জাইর বলসোনারো বর্তমানে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্পের নীতি ও ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মার্কিন বাণিজ্য শুল্কের হুমকি ও ওয়াশিংটনের প্রভাবের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকে প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয় করেছেন লুলা। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘ব্রাজিল কারও উঠোন নয়।’
অন্যদিকে ফ্লাভিও ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলেছেন। ওয়াশিংটন সফর ও নেতানিয়াহুর ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সমর্থন পাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে ট্রাম্পঘনিষ্ঠ ডানপন্থী ধারার প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরছেন। ট্রাম্পের প্রশংসা করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন মাদকবিরোধী জোটে যোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।
রবিবার সকালে সাও বার্নার্দো দো কাম্পোতে ভোট দেওয়ার পর লুলা বলেন, ‘আজ মানুষকে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং বর্বরতার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে।’ জরিপের হিসাব উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আসল জরিপ আজ ভোটের বাক্সেই প্রতিফলিত হবে।
রিও ডি জেনেইরোতে ভোট দিয়ে ফ্লাভিও বলেন, ‘আমাদের অভ্যন্তরীণ জরিপ বলছে, লুলাবিরোধী ভোটাররা আমার দিকে ঝুঁকছেন। আশা করি প্রথম ধাপেই জয়ের জন্য এটি যথেষ্ট হবে।’
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলে বাম ও ডানপন্থী মেরুকরণ থাকলেও ভোটারদের মধ্যে আগের মতো রাজনৈতিক উন্মাদনা নেই। বরং রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি একধরনের ক্লান্তি ও বিতৃষ্ণা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক দুর্নীতি কেলেঙ্কারিও এতে ভূমিকা রাখছে।
বেসরকারি ব্যাংক বাঙ্কো মাস্টারের পতন ঘিরে আর্থিক অনিয়মের তদন্ত দুই শিবিরকেই অস্বস্তিতে ফেলেছে। ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে ব্যাংকটির সাবেক প্রধানের কাছ থেকে নিজের সিনেমার জন্য অর্থায়ন নেওয়ার অভিযোগে অর্থ পাচারের তদন্ত চলছে। তিনি অবশ্য কোনো অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে বলসোনারো সমর্থকেরা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে দুর্নীতির প্রশ্নে কোনো পক্ষই নিজেদের পুরোপুরি নিষ্কলঙ্ক দাবি করতে পারছে না।
বছরের শুরুতে জাইর বলসোনারোর সমর্থকেরা সাও পাওলোর গভর্নর তারসিসিও দে ফ্রেইতাস বা সাবেক ফার্স্ট লেডি মিশেল বলসোনারোকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত জাইর তার বড় ছেলে ফ্লাভিওকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নেন।
প্যারানা রাজ্যের বাসিন্দা ক্লাউদিনে ফেরেইরা ভিয়ানা বলেন, ‘আমার প্রথম পছন্দ ছিলেন জাইর বলসোনারো। কিন্তু তিনি না থাকায় এবং লুলার বিপক্ষে শক্ত কোনো বিকল্প না থাকায় আমি ফ্লাভিওকেই ভোট দিচ্ছি।’
অন্যদিকে আমাজনাস রাজ্যের ভোটার এএমসি বলেন, ‘লুলা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় অনেক কাজ করেছেন। জাইর বলসোনারো আদিবাসীদের সুরক্ষা দুর্বল করেছিলেন। লুলা আমাজন সুরক্ষায় যা করেছেন, ফ্লাভিও ক্ষমতায় এলে তা হুমকিতে পড়বে।’
প্রথম দফার ভোটে কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশের বেশি বৈধ ভোট না পেলে আগামী ২৫ অক্টোবর শীর্ষ দুই প্রার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় দফার নির্বাচন হবে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি জাতীয় কংগ্রেস, গভর্নর ও রাজ্য আইনসভার সদস্য নির্বাচনেও ভোট দিচ্ছেন ব্রাজিলের নাগরিকেরা। কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে যে-ই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, সরকার পরিচালনায় তাকে কতটা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে, তা অনেকটাই নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের ফলাফলে।




