মাথা নোয়াবে না ইরান, জাতিসংঘ ভাষণে পেজেশকিয়ান

ভাষণের সময় মাসউদ পেজেশকিয়ান নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছবি তুলে ধরেন— রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ তুলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বুধবার ভাষণ দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। ভাষণের সময় তিনি নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও হামলায় নিহত ইরানি স্কুলশিশুদের ছবি তুলে ধরেন। ইরান কখনো মাথা নত করবে না বলে ভাষণে উল্লেখ করেন পেজেশকিয়ান। এ সময় বেসামরিক হতাহতের প্রসঙ্গ উঠলে অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রতিনিধি।
ভাষণে পেজেশকিয়ান ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের শিকার হিসেবে তুলে ধরেন এবং নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকার কথা জানান। তিনি বলেছেন, ‘হুমকি এড়াতে এবং দেশের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে পড়া থেকে রক্ষা করতে ইরানকে শক্তিশালী হতে হবে। আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে কেউ মনে না করে ইরানের শহরগুলোতে বোমা হামলা চালিয়ে কোনো জবাবদিহি ছাড়াই পার পাওয়া যাবে।’
আমাদের আঞ্চলিক সমস্যাগুলো এ অঞ্চলের দেশগুলোর হাতেই, এ অঞ্চলের মধ্যেই সমাধান করতে হবে। বাইরের শক্তির খেলনা হওয়া যাবে না
ইরানের প্রেসিডেন্টের দাবি, তার দেশ পারমাণবিক অস্ত্র চায় না। তবে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কোনো সীমাবদ্ধতা মেনে নেবে না।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। ইরানের দাবি, যেকোনো চুক্তিতে চিকিৎসা গবেষণা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন অনুযায়ী ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ থাকতে হবে। তবে ওয়াশিংটন যেকোনো ধরনের সমৃদ্ধকরণের বিরোধিতা করে।
পেজেশকিয়ান বললেন, ‘আমাদের দেশের জন্য শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি আমাদের স্বাভাবিক অগ্রগতির অংশ।’
সবাই হরমুজ প্রণালি থেকে সুবিধা পাবে, অথচ এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের সুযোগ থেকে আমরা বঞ্চিত হব, এটা হতে পারে না
মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের দীর্ঘদিনের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। পেজেশকিয়ান বললেন, ‘আমাদের আঞ্চলিক সমস্যাগুলো এ অঞ্চলের দেশগুলোর হাতেই, এ অঞ্চলের মধ্যেই সমাধান করতে হবে। বাইরের শক্তির খেলনা হওয়া যাবে না।’
ইরান যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের পথ ছিল হরমুজ প্রণালি। এখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ।ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘সবাই হরমুজ প্রণালি থেকে সুবিধা পাবে, অথচ এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের সুযোগ থেকে আমরা বঞ্চিত হব, এটা হতে পারে না। শত্রুতাপূর্ণ নৌবহরের স্থায়ী মোতায়েন এবং যুদ্ধের বিস্তার শান্তি বয়ে আনবে না।’
ইসরায়েল হত্যা করে, কিন্তু ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়
ইসরায়েলের ইরানে হামলারও সমালোচনা করেন পেজেশকিয়ান। এ পর্যন্ত সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়া মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব নেতার বক্তব্যেই ইসরায়েল গুরুত্ব পেয়েছে। তারা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ইরান, লেবানন ও সিরিয়ায় দেশটির হামলার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বৈত মানদণ্ড রয়েছে বলেও ইঙ্গিত দেন পেজেশকিয়ান। তার ভাষ্য, ‘ইসরায়েল হত্যা করে, কিন্তু ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এটি সত্যিই এক ট্র্যাজেডি, যা শুনলে সর্বোচ্চ যা হতে পারে, তা হলো যে কেউ হাসবে।’
ভাষণের শেষ দিকে পেজেশকিয়ান বললেন, ‘আমরা কখনো মাথা নত করব না বা হাঁটু গেড়ে বসব না। আমরা সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবে শক্তির ভাষা কখনো মেনে নেব না।’
ভাষণে পেজেশকিয়ান দাবি করেন, গত সাত মাস ধরে ইরানিরা ‘প্রতিদিন রাতে’ তাদের দেশের সমর্থনে বিক্ষোভ করে আসছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণের এক দিন পর ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন পেজেশকিয়ান। মঙ্গলবারের ভাষণে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে তিনি বিরত রেখেছেন। একই সঙ্গে সংঘাতের অবসানে কোনো চুক্তি না হলে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে নিশ্চিহ্ন’ করে দিতে পারেন বলেও সতর্ক করেন।
সূত্র : দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স






