যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় আর আস্থা নেই ইরানের, আলজাজিরাকে পেজেশকিয়ান

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় আর আস্থা নেই বলে জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শনিবার তিনি বলেছেন, আগের দফার আলোচনার পর ইরানের ওপর হামলা ও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
পেজেশকিয়ান আরও বলেছেন, কাতার ও পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইরানের বার্তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। গত জুনে দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতেই আলোচনা চলছে। তবে ওই সমঝোতার মেয়াদ গত মাসে শেষ হয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর যুদ্ধ শুরু হয়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার জন্য ইরান দায়ী নয় বলে দাবি করেছেন পেজেশকিয়ান। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রই ইরানের সামনে পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। তাই হরমুজ বন্ধ করা ছিল ‘স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া’।
তিনি বলেছেন, শক্তি প্রয়োগের বদলে আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান সম্ভব। যুদ্ধ শেষ হলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে।
সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আগ্রাসী পক্ষ হিসেবে উল্লেখ করে পেজেশকিয়ান জোর দাবি করেন, গত ২০০ বছরে ইরান কোনো দেশে হামলা করেনি।
তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মনে করেছিল কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। এ কারণে তারা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোকে যুদ্ধে টেনে এনেছে।
‘আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা প্রতিহত করেছি এবং দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকব,’— বলেছেন পেজেশকিয়ান।
তিনি বলেছেন, ইরানের কোনো কমান্ডারকে হত্যা কিংবা অর্থনৈতিক চাপ— কোনোটিই ইরানিদের পিছু হটতে বাধ্য করেনি।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মুসলিম দেশগুলোর আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, যেসব ঘাঁটি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযান পরিচালিত হয়, সেগুলোকে ইরান লক্ষ্যবস্তু করেছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে তেহরানের কোনো দাবি নেই। অন্যপক্ষ নিয়ম লঙ্ঘন করলেই ইরান তার জবাব দেয়।
ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধেরও যোগসূত্র রয়েছে বলে দাবি করেন পেজেশকিয়ান।
তিনি বলেন, ‘যারা ইরানিদের ওষুধ ও কাঁচামাল থেকে বঞ্চিত করছে, তারাই গাজার মানুষের খাবার ও পানি বন্ধ করে দিয়েছে।’
নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানিদের দুর্বল করা যাবে বলে যারা মনে করেন, তারা ‘ভুল হিসাব করেছেন’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।’
পেজেশকিয়ান বলেছেন, আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এ অঞ্চলের সম্পদ নিয়ন্ত্রণের জন্য মুসলিম দেশগুলোকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চায় বলেও অভিযোগ করেন পেজেশকিয়ান।
ইসলামি বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করতে সৌদি আরব ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ইয়েমেন প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরানপন্থী হুতিদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তেহরানের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে অন্যায়ের শিকার সবার প্রতি ইরান সংহতি জানায়।
হুতি ও সৌদি আরবকে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
‘এক ভাইয়ের সঙ্গে আরেক ভাইয়ের লড়াই করা উচিত নয়,’ বলেন পেজেশকিয়ান। বিরোধ মেটাতে ইরান সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
পেজেশকিয়ান আরও জানিয়েছেন, তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে দুবার বৈঠক করেছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মোজতবা প্রকাশ্যে আসেননি। এর মধ্যে একটি বৈঠক সাত ঘণ্টা ধরে চলে। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ভারসাম্যহীনতা কাটিয়ে ওঠার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন পেজেশকিয়ান।
তার দাবি, ইরানকে স্বনির্ভর হতে বাধা দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চেষ্টা করছে। তবে ইরান তার জনগণের জন্য বিনিয়োগ করবে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়েও কথা বলেছেন পেজেশকিয়ান। তিনি অভিযোগ করেন, ইরানের ‘শত্রুরা’ কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করার চেষ্টা করছে।
তবে দেশে নজিরবিহীন ঐক্য ও সংহতি রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। সেখানে তারা যুদ্ধ শেষ করতে সাত দিনের একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে। ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করতে হবে। জব্দ করা প্রায় ১২০০ কোটি ডলারের ইরানি সম্পদ ছাড়তে হবে। লেবানন ও ইয়েমেনসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি মানতে হবে।
এর বিনিময়ে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের বাণিজ্যিক তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি বলেছেন, পরিকল্পনার প্রাথমিক পদক্ষেপ বাস্তবায়নে চার থেকে পাঁচ দিন লাগবে। ষষ্ঠ দিনে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে। সপ্তম দিনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ পারস্পরিকভাবে সম্মত বিষয়গুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হবে।




