শত্রুতা শেষে শান্তির দুয়ারে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কয়েক দশকের শত্রুতা, প্রক্সি যুদ্ধ, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ এবং অবশেষে এ বছর সরাসরি সামরিক সংঘাতের পর ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। প্রাথমিকভাবে ইলেক্ট্রনিক উপায়ে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ইরানি প্রেসিডেন্ট। শুক্রবার জেনেভায় হবে চূড়ান্ত আলোচনা ও চুক্তি সই। আনুষ্ঠানিক এই চুক্তির ১৪ দফা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
যা আছে ১৪ দফায়
এতে হরমুজ প্রণালি আবার উন্মুক্ত করা, সামরিক সংঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, ইরানের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং দেশটির পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
শুক্রবার স্মারকে স্বাক্ষরের পর চূড়ান্ত চুক্তির শর্ত নির্ধারণে ৬০ দিনের আলোচনা শুরু হবে। সমঝোতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে ইরানের বিরুদ্ধে নৌঅবরোধ তুলে নেবে এবং ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
নথিতে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনার কথাও রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ইরানের জব্দ সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে হবে আলোচনা।
পরমাণু ইস্যুতে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে নিম্নমাত্রার উপাদানে রূপান্তরের বিষয়েও একমত হয়েছে উভয় পক্ষ।
চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান নতুন কোনো পরমাণু কার্যক্রম সম্প্রসারণ করবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রও নতুন নিষেধাজ্ঞা বা অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন থেকে বিরত থাকবে। চুক্তি বাস্তবায়ন তদারকির জন্য রয়েছে যৌথ ব্যবস্থা গঠন এবং পরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নেওয়ার পরিকল্পনাও।
সংঘাতের ইতিহাস
ইরান যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান সংঘাতের শিকড় ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবেরও আগে বিস্তৃত। ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সমর্থনে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার পর শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসন আরও শক্তিশালী হয়। সেসময় ইরান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও ছিল তার। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে শাহের পতন ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী নীতি গ্রহণ করে নতুন ইসলামি প্রজাতন্ত্র।
পরবর্তী কয়েক দশকে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং ইরান-সমর্থিত প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। উত্তেজনা কমানোর জন্য বিভিন্ন সময়ে একাধিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ২০১৫ সালের ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ বা ইরান পারমাণবিক চুক্তি, যার মাধ্যমে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আরোপে সম্মত হয়েছিল এবং বিনিময়ে শিথিল করা হয় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা।
তবে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলে সম্পর্ক আবার দ্রুত অবনতি ঘটে। এরপর ভিয়েনা, দোহা ও ওমানে একাধিক দফা আলোচনা হলেও হয়নি স্থায়ী সমঝোতা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওমানে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ পরোক্ষ আলোচনাও ব্যর্থ হলে কূটনৈতিক সমাধানের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র,ইসরায়েল-ইরানের সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নেয় দীর্ঘদিনের এই বৈরিতা।
টাইমলাইন
• ইরানের ভেতরে অসন্তোষ ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা (জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি)
ইরানের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও জ্বালানি-বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে দেশ জুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা অর্থনৈতিক সংস্কার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সরকারের জবাবদিহি দাবি করে। একই সময়ে ওমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও উভয় পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে তা ভেঙে যায়। কূটনৈতিক সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়।
• যুদ্ধের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত (২৭ ফেব্রুয়ারি)
ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে দূতাবাসের অপ্রয়োজনীয় কর্মীদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেন। একই দিন ওয়াশিংটনে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যৌথ সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’র অনুমোদন দেন এবং মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীকে হামলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে নির্দেশ দেন। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে নেওয়া হয় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায়।
• অপারেশন এপিক ফিউরি ও খামেনি নিহত (২৮ ফেব্রুয়ারি)
ভোর থেকে শুরু হওয়া অভিযানে ইরানের সামরিক সদর দপ্তর, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। মাত্র ১২ ঘণ্টায় প্রায় ৯০০টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সংঘটিত হয়, যা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ সমন্বিত সামরিক অভিযান হিসেবে বিবেচিত হয়।
হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তা নিহত হন। ক্ষমতার শূন্যতা এড়াতে দ্রুত নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত করা হয় মোজতবা খামেনিকে। একই দিনে মিনাবে একটি নৌঘাঁটির নিকটবর্তী বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে বহু শিক্ষার্থী ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
• ইরানের পাল্টা আঘাত ও আঞ্চলিক যুদ্ধ (১-৩ মার্চ)
প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর দিকে শত শত ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। কাতার, কুয়েত ও ইরাকে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে একাধিক হামলা হয়। ২ মার্চ হিজবুল্লাহ পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধে যোগ দিলে উত্তর ইসরায়েল জুড়ে রকেট হামলা শুরু হয়। এর জবাবে ইসরায়েল বৈরুত ও দক্ষিণ লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। সংঘাত দ্রুত ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সীমা ছাড়িয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে জড়িয়ে ফেলে। বাহরাইন ও সাইপ্রাসে অবস্থিত ঘাঁটিগুলোর সুরক্ষায় অতিরিক্ত রয়্যাল এয়ার ফোর্স মোতায়েন করে যুক্তরাজ্য।
• জাতিসংঘের নিন্দা ও প্রস্তাব (১১ মার্চ)
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় আরব দেশগুলো জরুরি ভিত্তিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহ্বানের দাবি জানায়। পাস হওয়া প্রস্তাবে ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার নিন্দা করা হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলপথে অবাধ নৌচলাচলের অধিকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। রাশিয়া ও চীন সরাসরি বিরোধিতা না করলেও ভোটদানে বিরত থাকে, যা তাদের সতর্ক অবস্থানকে নির্দেশ করে।
• অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি অবরোধ (মধ্য–শেষ মার্চ)
ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়। ২৫-২৬ মার্চ ইরান জর্ডান ও বাহরাইনের মতো মার্কিন মিত্র দেশগুলোকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি দেয়। যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত নৌবহর ও বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হবে না।
• ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি (১ এপ্রিল)
ট্রাম্প দাবি করেন, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপে ইরান যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত না করলে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তার ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নেওয়া’ মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ইরান এসব বক্তব্যকে প্রচারণা বলে উড়িয়ে দেয় এবং আত্মসমর্পণের কোনো প্রশ্ন নেই বলে জানায়।
• পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় প্রথম সাময়িক যুদ্ধবিরতি (৭-৮ এপ্রিল)
পাকিস্তান ও চীনের কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে দুপক্ষ যুদ্ধবিরতির আলোচনায় বসতে সম্মত হয়। ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির আওতায় সামরিক অভিযান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার এবং ইসলামাবাদে আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। যদিও উভয় পক্ষ একে অপরকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত করে, তবু আলোচনার প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে না। ২১ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প।
• চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির খসড়া (মে-জুন)
কয়েক দফা কঠিন আলোচনার পর মধ্যস্থতাকারীরা যুদ্ধপরবর্তী নিরাপত্তা কাঠামো, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছায়। ১৪ জুন একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক প্রকাশ করা হয়, যা সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী চুক্তি কার্যকর হলে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আশা করা হচ্ছে যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হওয়ার।










