সেনা সরিয়ে নিলেও ইরাকের নিয়ন্ত্রণ মার্কিনিদের হাতে
- বাগদাদের তেলের টাকা কেন এখনো নিউ ইয়র্কে

ইরাক থেকে সরে গেছে মার্কিন সেনা। দুই দশকের বেশি সময়ের যুদ্ধের পর এই বিদায়কে ইরান ও তাদের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলো নিজেদের জয় হিসেবে দেখছে। কিন্তু সেনা না থাকলেও ইরাকের নিয়ন্ত্রণ থাকছে আমেরিকার হাতেই। কারণ, দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস তেল বিক্রির ডলার এখনো নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। গত বুধবার, সেনা প্রত্যাহারের দিনই প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দেশটির আর্থিক ব্যবস্থার এই চিত্র।
ইরাকে ২০০৩ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর এই ব্যবস্থার শুরু। তখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটের অস্থায়ী প্রশাসন ‘ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর ইরাক’ নামে একটি তহবিল তৈরি করে। নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা সেই তহবিলে ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ জমা হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। যুদ্ধের পর দেশ পুনর্গঠন ও উন্নয়নকাজে অর্থ ব্যবহারের পাশাপাশি সাদ্দাম হোসেনের শাসনামল-সংক্রান্ত মামলা, পাওনাদারদের দাবি ও অন্যান্য আইনি ঝুঁকি থেকে অর্থ সুরক্ষিত রাখাও ছিল এর উদ্দেশ্য।
পরে ওই তহবিল ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি হিসাবে পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ছাড়লেও হিসাবটি এখনো আগের মতোই রয়েছে নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, পরবর্তী প্রতিটি মার্কিন প্রেসিডেন্টই তা নবায়ন করেছেন।
এর গুরুত্ব বোঝা যায় ইরাকের অর্থনীতিতে তেলের ভূমিকা দেখলেই। দেশের মোট সরকারি আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে তেল থেকে। ফলে তেল বিক্রির ডলারের প্রবাহের ওপর প্রভাব রাখার অর্থ ইরাকের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও যথেষ্ট প্রভাব রাখা।
২০২০ সালে ইরাক সরকার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তখন ওয়াশিংটন নিউ ইয়র্কের ওই তহবিলে ইরাকের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাগদাদ সেই অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসে। যদিও দখলদারির শুরুর সময়ের তুলনায় ইরাক এখন নিজের আর্থিক বিষয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
তাহলে এত বছর পরও এই ব্যবস্থা টিকে আছে কেন? ইরাকি সরকারের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেছেন, এই ব্যবস্থা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তেল আয়ের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আস্থা বাড়ে। আমদানি ও বাণিজ্যের জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলারে সহজে প্রবেশাধিকার পাওয়া যায়। পাশাপাশি পাওনাদারদের দাবি, মামলা বা হঠাৎ আর্থিক ধাক্কা থেকে তেলের অর্থ কিছুটা সুরক্ষিত থাকে। এর ফলে ইরাকের মুদ্রার বিনিময় হার ও অর্থনীতির ওপরও আস্থা বজায় থাকে।
তবে এর অন্যদিকও রয়েছে। ডলারের সরবরাহে কড়াকড়ির কারণে ইরাকে সরকারি বিনিময় হারের পাশাপাশি আলাদা অনানুষ্ঠানিক বাজার তৈরি হয়েছে। ফলে সরকারি ও কালোবাজারি দরের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এই ব্যবধানকে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে লেনদেনের ঝুঁকির মূল্য হিসেবেও দেখা হয়।
ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সংঘাতেও ইরাক এই ব্যবস্থার কারণে চাপের মধ্যে পড়ে। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চাপের নীতি নিয়েছেন। ইরান ইরাককে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পথ হিসেবে ব্যবহার করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে শুরু হওয়া যুদ্ধ সেই চাপ আরও বাড়িয়েছে। গত বছর ইরানের হয়ে অর্থ পাচারের অভিযোগে ইরাকের কয়েকটি ব্যাংক ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
ডলার সরবরাহের ক্ষেত্রে ইরাক দীর্ঘদিন নিলাম ব্যবস্থা ব্যবহার করত। ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রির এই ব্যবস্থায় বেসরকারি ব্যাংক ও মুদ্রাবিনিময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিদিন ইরাকি দিনার দিয়ে ডলার কেনার সুযোগ দিত। কিন্তু ২০২৫ সালের শুরুতে ইরাক আনুষ্ঠানিকভাবে সেই নিলাম ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। ইরানের মতো নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পক্ষগুলোর কাছে ডলার পাচারের অভিযোগের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযানের অংশ হিসেবেই এই পরিবর্তন হয়। এক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ছিল বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
অর্থাৎ, ৩০ সেপ্টেম্বর মার্কিন সেনারা ইরাকের শেষ ঘাঁটিগুলো ছেড়ে গেলেও নিউ ইয়র্কের আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে ইরাকের তেল আয়ের যে যোগসূত্র তৈরি হয়েছিল ২০০৩ সালে, তা এখনো বহাল। সেনা নেই, কিন্তু সেই আর্থিক সম্পর্কই ওয়াশিংটনের প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে রয়েছে।



