ইসরায়েলের নির্বাচনে নিষিদ্ধ আরব দলগুলো, তা কেন গুরুত্বপূর্ণ

ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন এক আরব নারী। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
ইসরায়েলের আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন দুটি আরব-প্রধান রাজনৈতিক জোটকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথে আটকে দিয়েছে। একই সঙ্গে দুই আরব রাজনীতিককেও প্রার্থী হিসেবে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কমিশনের প্রধান।
তবে এ সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত নয়। আগামী সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি পর্যালোচনা করবে। অতীতেও আদালত আরব দল ও প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার এমন সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে। ফলে ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে তারা শেষ পর্যন্ত অংশ নিতে পারবেন কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
কোন দলগুলো বাদ পড়েছে
প্রথম দলটি হলো জয়েন্ট লিস্ট। এতে হাদাশ, বালাদ ও তায়াল রয়েছে। হাদাশে ইহুদি ও আরব— দুই সম্প্রদায়ের সদস্য আছেন। তায়াল মূলত ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে। বালাদ সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলে।
দ্বিতীয় দলটি হলো রাম (Ra’am)। দলটির নেতৃত্বে আছেন মানসুর আব্বাস। অন্য আরব দলগুলোর তুলনায় রাম বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে বাজেট ও আরব জনগোষ্ঠীর সেবা নিয়ে আলোচনায় বেশি আগ্রহী ছিল। ২০২১-২২ সালের জোট সরকারেও দলটি অংশ নিয়েছিল।
ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে বর্তমানে হাদাশ-তায়ালের পাঁচটি এবং রামের পাঁচটি আসন রয়েছে। বালাদের কোনো আসন নেই। আরব নাগরিকরা ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ।
কেন নিষিদ্ধ করার চেষ্টা
ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, কোনো দল বা প্রার্থী যদি দেশটির ‘ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে অস্তিত্ব অস্বীকার করে, বর্ণবাদে উসকানি দেয় বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম সমর্থন করে, তাহলে তাকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা যায়। এ আইনের ভিত্তিতেই নিষেধাজ্ঞার আবেদন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের ওতজমা ইয়েহুদিতসহ ডানপন্থী দলগুলো এসব আবেদন করেছে।
তবে ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারা জয়েন্ট লিস্ট ও রামকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে আইনি ভিত্তি দেখেননি। হাদাশের ওফের ক্যাসিফের ক্ষেত্রেও তিনি একই মত দিয়েছেন। তার মতে, এসব ক্ষেত্রে প্রমাণ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি।
বালাদ নেতা সামি আবু শেহাদেহর বিষয়টি আলাদা। ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত তার একটি নিবন্ধকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম সমর্থনের অভিযোগ আনা হয়েছে। শেহাদেহ এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি সহিংসতা বা সশস্ত্র সংগ্রাম সমর্থন করেন না।
ভোটের রাজনীতিতে এর গুরুত্ব
আরব নাগরিকরা ইসরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ। তাই তাদের ভোট পার্লামেন্টের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ।
রাম ও জয়েন্ট লিস্ট— দুই দলই নির্বাচনে থাকলে আরব ভোটের একটি বড় অংশ তাদের দিকে যেতে পারে। কিন্তু তারা বাদ পড়লে এই ভোট অন্য দলগুলোর দিকে যেতে পারে। এতে পার্লামেন্টে সরকার গঠনের হিসাবও বদলে যেতে পারে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। তাই কয়েকটি আসনও জোট গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে আরব দলগুলোর ভোট স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর পক্ষে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বিরোধী দলগুলোর মধ্যেও আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠন বা তাদের সমর্থন নেওয়া নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
বিতর্কিত ডানপন্থী দলগুলো নির্বাচনে থাকছে
এ সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি হলো, আরব দলগুলোকে নিষিদ্ধ করার আবেদন গ্রহণ করা হলেও ডানপন্থী দুই দল—বেন-গভিরের ওতজমা ইয়েহুদিত এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের রিলিজিয়াস জায়নিজম— নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি পেয়েছে।
এ দুই দলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের নিয়ে কঠোর অবস্থান এবং গাজা ও পশ্চিম তীরের সহিংসতা চালানোর বিষয়ে বিতর্কিত নীতির অভিযোগ রয়েছে। তাদের নিষিদ্ধ করার আবেদন নির্বাচন কমিশন নাকচ করেছে।
এ কারণেই রাজনৈতিক পরিসরে দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকারকর্মী ও আরব দলগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে একদিকে সীমিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া ডানপন্থী দলগুলো নির্বাচনে থাকছে।
অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞার পক্ষের দলগুলোর বক্তব্য হলো, নির্বাচনী আইনে নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করলে কোনো দল বা প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই শেষ কথা নয়
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা নয়। কমিটিতে পার্লামেন্টের বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা থাকেন। ফলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে নির্বাচনের বাইরে রাখার সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর ভূমিকা থাকে।
এরপর বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে যায়। অতীতে আদালত আরব দল ও প্রার্থীদের নিষিদ্ধ করার কয়েকটি সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে। ২০২২ সালেও বালাদকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আদালত বাতিল করেছিল।
এবার আদালত কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সামনে কী হতে পারে
সুপ্রিম কোর্ট যদি নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে, তাহলে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকরা অন্য দলকে ভোট দিতে পারবেন। কিন্তু তাদের প্রধান দুটি আরব-প্রধান রাজনৈতিক দল ভোটে থাকবে না।
আর আদালত যদি সিদ্ধান্তগুলো বাতিল করে, তাহলে রাম ও জয়েন্ট লিস্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। ক্যাসিফ ও আবু শেহাদেহর প্রার্থিতার বিষয়েও আদালতকে সিদ্ধান্ত দিতে হবে।
ফলে বিষয়টি শুধু কয়েকটি দল বা প্রার্থীর নির্বাচনে থাকা না-থাকার প্রশ্ন নয়। এটি ইসরায়েলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নাগরিকের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, নির্বাচনী আইনের প্রয়োগ এবং পার্লামেন্টে ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের হিসাব— তিনটিকেই প্রভাবিত করতে পারে।
২৭ অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে এখন তাই মূল নজর সুপ্রিম কোর্টের দিকে। কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর শেষ কথা বলবে আদালত।
সূত্র : আল জাজিরা




