ইসরায়েলে বদলের হাওয়া
- আইজেনকোটকে সরকার গঠনের ডাক ইসরায়েলের প্রেসিডেন্টের
- নেতানিয়াহুর সতর্কবার্তা, “ইসলামপন্থীদের ওপর নির্ভরশীল এমন সরকার ভেতর থেকে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে তছনছ করে ফেলবে।”

ইসরায়েলের রাজনীতিতে বদলের হাওয়া। দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতা ধরে রাখার সমীকরণে এবার বড় ধাক্কা। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে কোনও পক্ষই পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এই পরিস্থিতিতে বিরোধী নেতা ও ইয়াশার পার্টির প্রধান গাদি আইজেনকোটকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। শনিবার, ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় এই সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। রবিবার বিকেল ৫টায় জেরুজালেমের প্রেসিডেন্টের বাসভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে আইজেনকোটের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার কথা। তবে দায়িত্ব পাওয়া আর সরকার গঠন এক নয়। সামনে কঠিন রাজনৈতিক দর-কষাকষি।
নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসন
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী। প্রথমবার তিনি প্রধানমন্ত্রী হন ১৯৯৬ সালে। সেই দফায় ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত। এরপর ২০০৯ সালে ফের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০২১ সালে তাঁর সরকারের পতন হয়। ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। সব মিলিয়ে প্রায় ১৯ বছর ধরে ইসরায়েলের সরকারপ্রধানের দায়িত্ব সামলেছেন নেতানিয়াহু। তবে আইজেনকোটের হাতে সরকার গঠনের দায়িত্ব যাওয়ার অর্থ এই নয় যে এখনই নেতানিয়াহুর সরকারের পতন ঘটছে। নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত তাঁর মন্ত্রিসভাই ক্ষমতায় থাকবে।
কে এই গাদি আইজেনকোট
১৯৬০ সালে ইসরায়েলের তিবেরিয়াসে জন্ম আইজেনকোটের। ১৯৭৮ সালে সেনাবাহিনীর গোলানি ব্রিগেডে যোগ দেন তিনি। দীর্ঘ সামরিক জীবনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ছিলেন ইসরায়েলের সেনাপ্রধান। সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর ২০২২ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন। বেনি গান্তজের ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টির হয়ে পার্লামেন্ট সদস্য হন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভাতেও দায়িত্ব পালন করেন। পরে সরকারের নীতির সঙ্গে মতপার্থক্য তৈরি হলে গান্তজের সঙ্গে সরকার ছাড়েন। পরবর্তী সময়ে নিজের রাজনৈতিক দল ইয়াশার গড়ে তোলেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে দলটি ২১টি আসন পায়।
সরকার গঠনের পথে বাধা
ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গড়তে প্রয়োজন ৬১টি আসন। নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৫৩টি। আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের আসন ৪৮। আরব দলগুলির হাতে রয়েছে ১৯টি আসন। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনায় আইজেনকোটের পক্ষে ৬৭ জন আইনপ্রণেতার প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলি সুপারিশ করেছে। নেতানিয়াহুর পক্ষে সুপারিশ এসেছে ৪৬ জনের। সাত সদস্যের ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম কোনও প্রার্থীর নাম সুপারিশ করেনি। তবে এই সমর্থন সরকার গঠনের নিশ্চয়তা নয়।
আইজেনকোটের সামনে মূলত তিনটি পথ। আরব দলগুলির সমর্থন নিয়ে সরকার গড়া, অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলির সঙ্গে সমঝোতা করা অথবা নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন। প্রতিটি পথেই বাধা রয়েছে। আরব দলগুলির সমর্থন নিতে তাঁর জোটের কয়েকটি দল রাজি নয়। অন্যদিকে অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলি বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতি বজায় রাখতে চায়। আইজেনকোটের শিবির আবার সবার জন্য সামরিক বা জাতীয় পরিষেবা চালুর পক্ষে। ফলে এই প্রশ্নে সমঝোতা কঠিন। লিকুদের সঙ্গে সমঝোতার ক্ষেত্রেও নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার মতপার্থক্য বড় বাধা।
নেতানিয়াহুর পাল্টা বার্তা
শনিবার প্রকাশিত আগে থেকে ধারণ করা এক ভাষণে নেতানিয়াহু আরব দলগুলির সমর্থনে সরকার গঠনের সম্ভাবনার তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁর দাবি, ইসলামপন্থী দলগুলির ওপর নির্ভরশীল সরকার ইসরায়েলকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেবে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতির চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই ভাষণে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের আহ্বান জানান।
নেতানিয়াহুর বক্তব্যের জবাবে ইয়াশার পার্টি লিকুদ ও তার মিত্রদের উগ্রপন্থী শরিকদের সঙ্গে জোট ভাঙার আহ্বান জানিয়েছে। এক্সে দেওয়া পোস্টে দলটি বলেছে, লিকুদ চাইলে আইজেনকোটের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যের সরকারে যোগ দিতে পারে।আইজেনকোটের হাতে সরকার গঠনের জন্য প্রথমে ২৮ দিন থাকবে। প্রয়োজনে প্রেসিডেন্ট আরও ১৪ দিন সময় দিতে পারেন। তিনি ব্যর্থ হলে অন্য কোনও আইনপ্রণেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোনও পক্ষই সরকার গড়তে না পারলে ইসরায়েলে ফের নির্বাচন হতে পারে।



