বালুর নীরব জীবন
লাইপজিগের প্রদর্শনীতে উঠে আসছে উপকূল, রাজনীতি ও মানুষের অস্তিত্বের গল্প

প্রদর্শনীতে উপকূল, রাজনীতি ও মানুষের অস্তিত্বের গল্প। ছবি: জাভেদ কায়সার
জার্মানির লাইপজিগে ‘Porous Grounds’ প্রদর্শনী বালুকে কেন্দ্র করে শিল্প, নৃতাত্ত্বিক গবেষণা ও রাজনীতির এক ব্যতিক্রমী সংলাপ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের ভাসানচর থেকে ফ্রান্সের মার্সেই— চারটি উপকূলের বালু ও পলির ‘সামাজিক জীবন’ উঠে এসেছে এই উদ্যোগে।
আমরা প্রতিদিন বালুর ওপর দিয়ে হাঁটি। ঘর বানাই, রাস্তা তৈরি করি, কাচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। অথচ বালু নামের এই সাধারণ পদার্থটিকে আমরা আলাদা করে ‘দেখি’ না। অথচ পানি ব্যবহারের পর পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর একটি হলো এই বালু। সমুদ্রের তলদেশের ভূতাত্ত্বিক গঠন থেকে শুরু করে নতুন ভূমি তৈরি, নগরায়ণ, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা উপকূলকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে রক্ষা—সবখানেই বালুর উপস্থিতি।
কিন্তু বালু সব জায়গায় একই রকম নয়। সমুদ্র উপকূলের বালু, নদীর বালু কিংবা পলি—প্রতিটির গঠন, রং, কণার আকার ও বৈশিষ্ট্য আলাদা। আর এই পার্থক্যই বদলে দেয় বালুর ব্যবহার, মূল্য, সামাজিক তাৎপর্য ও রাজনৈতিক ভূমিকা। কোথাও বালু নির্মাণশিল্পের অপরিহার্য কাঁচামাল, কোথাও তা উপকূলীয় সুরক্ষার উপাদান, আবার কোথাও বালু ও পলি ভূমি, জীবিকা এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের কেন্দ্রে অবস্থান করে।
এই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে জার্মানির হালে অবস্থিত ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল অ্যানথ্রোপলজির ডিএফজি-অর্থায়িত এমি নোয়েদার রিসার্চ গ্রুপ ‘S.AND – দ্য ফিউচার অব কোস্টাল সিটিজ ইন দ্য ইন্ডিয়ান ওশান’ ২০২৩ সাল থেকে বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলে নৃতাত্ত্বিক গবেষণা পরিচালনা করছে। লুকাস লেই-এর নেতৃত্বে এই দলে কাজ করছেন তারিণী মোঙ্গা, তেরেসা ক্রেমার এবং বাংলাদেশের গবেষক জাভেদ কায়সার। বাংলাদেশ, ভারত, কেনিয়া ও ফ্রান্সের উপকূলীয় অঞ্চলে তাদের গবেষণায় বালু, পলি ও অন্যান্য দানাদার পদার্থের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত জীবন অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
ভৌগোলিকভাবে দূরবর্তী এসব অঞ্চলকে একত্রে বিবেচনা করলে দেখা যায়, তাদের উপকূলীয় পরিবর্তন, অবকাঠামো নির্মাণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত সংকটের মধ্যে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক সংযোগ। S.AND গবেষণা দল বালুকে কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ বা নির্মাণসামগ্রী হিসেবে দেখে না; বরং বালুর চলাচল, ব্যবহার, উত্তোলন ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে কীভাবে মানুষের জীবন, সামাজিক সম্পর্ক এবং উপকূলীয় ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে—তা বোঝার চেষ্টা করে।
চারটি উপকূল, বালুর চারটি ভিন্ন জীবন
S.AND গবেষণা দলের সদস্যদের কাজের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতা। তবে এসব গবেষণার একটি অভিন্ন প্রশ্ন হলো—বালু ও পলির মতো আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ পদার্থ কীভাবে মানুষের জীবন, ভূমি, অবকাঠামো এবং পরিবেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকে?
গবেষণা দলের প্রধান লুকাস লেই কাজ করছেন ফ্রান্সের মার্সেই উপকূলে সেডিমেন্ট বা পলির চলাচল, ব্যবস্থাপনা এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জ্ঞান ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে। মার্সেইয়ের বন্দর ও উপকূলীয় অঞ্চলে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে উত্তোলিত সেডিমেন্টের একটি বড় অংশ দূষিত হওয়ায় তা সরাসরি নির্মাণসামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। এসব পলির ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও অপসারণে কাজ করে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। একই সময়ে উপকূলীয় ক্ষয় মোকাবিলায় সৈকতে বালু পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে কোন সেডিমেন্টকে দূষিত হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, কোনটি কোথায় সরানো হবে এবং কোন ধরনের উপাদান উপকূলীয় সুরক্ষার জন্য গ্রহণযোগ্য হবে—এসব প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে পরিবেশগত জ্ঞান, নীতিনির্ধারণ ও নগর ব্যবস্থাপনার রাজনীতি। লেই-এর গবেষণা এসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেডিমেন্ট কীভাবে দৃশ্যমান, ব্যবহারযোগ্য কিংবা বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচিত হয়, তা অনুসন্ধান করে।
ভারতের গোয়ায় তারিণী মোঙ্গা গবেষণা করছেন বালু, পলি ও কাদার চলাচল এবং উপকূলীয় ভূমির পরিবর্তন নিয়ে। তার কাজের কেন্দ্রে রয়েছে ভূমি ব্যবহার, উপকূলীয় অবকাঠামো, সেডিমেন্টের নিষ্কাশন এবং ভূমির মালিকানা ও প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন। দ্রুত নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে গোয়ার উপকূলীয় অঞ্চল কীভাবে নতুনভাবে গড়ে উঠছে, এবং এসব পরিবর্তনে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে উপকূলীয় ভূমি ও সম্পদের সম্পর্ক কীভাবে বদলে যাচ্ছে—তা তার গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদী ও উপকূলীয় সেডিমেন্টের ব্যবস্থাপনা এবং ভূমি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে কীভাবে সাধারণ সম্পদের ওপর অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই প্রশ্নও বিশেষ গুরুত্ব পায়।
কেনিয়ার মোম্বাসা শহরে তেরেসা ক্রেমার-এর গবেষণায় উঠে এসেছে বালুর চলাচল, উত্তোলন, বাণিজ্য এবং নগরজীবনের পারস্পরিক সম্পর্ক। বালু কীভাবে উত্তোলনের স্থান থেকে শহরের বিভিন্ন বাজার ও ডিপোতে পৌঁছায়, কীভাবে তা নির্মাণশিল্পের উপাদান হয়ে ওঠে এবং কীভাবে এর সঙ্গে মানুষের জীবিকা, শ্রম ও দৈনন্দিন জীবন জড়িয়ে থাকে—এসবই তার গবেষণার কেন্দ্রে। একই সঙ্গে উপকূলীয় সুরক্ষা, সৈকতের পরিবর্তন এবং নগর উন্নয়নের সঙ্গে বালুর সম্পর্কও তিনি অনুসন্ধান করছেন। তার কাজ দেখায়, বালু কেবল শহর নির্মাণের উপাদান নয়; বরং শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ কল্পনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের উপকূলীয় চরাঞ্চল, বিশেষ করে ভাসানচরের পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছেন জাভেদ কায়সার। তার গবেষণায় অনুসন্ধান করা হচ্ছে, একটি নতুন পলি জমা চরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবন কীভাবে বালু, পলি, পানি ও ভূমির সঙ্গে নিবিড়ভাবে আবদ্ধ হয়ে আছে। ভাসানচরের মতো পরিবর্তনশীল ভূপ্রকৃতিতে ভূমি কেবল বসবাসের জায়গা নয়; এটি একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা, মানবিক সহায়তা, জীবিকা এবং মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার একটি ক্ষেত্র। নতুন ভূমি তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রক্রিয়ার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জীবনযাপন কীভাবে যুক্ত হয়, এবং এসব প্রক্রিয়ায় মানবিক ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কীভাবে কাজ করে—তা তার গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ দিক। জাভেদ কায়সার বাংলাদেশের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন এবং বর্তমানে ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল অ্যানথ্রোপলজির S.AND গবেষণা দলের সদস্য হিসেবে তাঁর পিএইচডি গবেষণা পরিচালনা করছেন।
গবেষণার বাইরে: ‘Porous Grounds’ প্রদর্শনী
বালু নিয়ে পরিচালিত এসব নৃতাত্ত্বিক গবেষণাকে আরও বিস্তৃত জনপরিসরে উপস্থাপন এবং নতুনভাবে অর্থ তৈরি করার উদ্দেশ্যে জার্মানির লাইপজিগ শহরে আয়োজন করা হয়েছে একটি ব্যতিক্রমী প্রদর্শনী— ‘Porous Grounds’। KV – Verein für zeitgenössische Kunst Leipzig এবং S.AND Research Group-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে গবেষকদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, সংগৃহীত নৃতাত্ত্বিক উপাদান এবং শিল্পকর্মকে একত্রিত করা হয়েছে। প্রদর্শনীটি ৮ নভেম্বর থেকে ১৯ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত চলবে।
বালু নিয়ে S.AND দলের কাজ কেবল একাডেমিক লেখালেখির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে তারা সেমিনার, রিডিং গ্রুপ ও জন-আলোচনার আয়োজন করেছেন। একই সঙ্গে বালু ও পানি নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি সমাজকর্মী, স্থপতি, ডিজাইনার ও শিল্পীদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি মতবিনিময় করেছেন। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বালুর মতো দানাদার পদার্থকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। বালু কীভাবে আমাদের কাছে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, কীভাবে তা নিয়ে জ্ঞান তৈরি হয় এবং কীভাবে নান্দনিক, ব্যবহারিক ও বৈজ্ঞানিক বর্ণনাগুলো একে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রদান করে—এসব প্রশ্নও এই আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
শিল্প ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণার কথোপকথন
‘Porous Grounds’ প্রদর্শনীতে একাডেমিক গবেষণা ও শিল্পচর্চার মধ্যে একটি কথোপকথন তৈরি করা হয়েছে। এখানে S.AND গবেষণা দলের কাজের পাশাপাশি বালু নিয়ে শিল্পচর্চা করা শিল্পী ও দলগুলোর কাজও প্রদর্শিত হচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সিমোন আলবার্স, ফিল্ড-০, লারা আলমারসেগুই এবং জিউই লি ও ফিলিপ সি. রাইনার।
বালুর কণা, শব্দ, গঠন, ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করে এসব শিল্পী তাদের নিজস্ব শৈল্পিক ভাষায় কাজ করেছেন। তাদের কাজের মধ্য দিয়ে বালুকে কেবল একটি বস্তু হিসেবে নয়, বরং অনুভব, পর্যবেক্ষণ ও চিন্তার একটি মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে প্রদর্শনীতে নৃতাত্ত্বিক গবেষণা ও শিল্পকর্ম পাশাপাশি অবস্থান করে বালুর বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে অনুধাবনের সুযোগ তৈরি করে।
এই প্রদর্শনীর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, বালুর সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনকে ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা এবং শিল্প ও বিজ্ঞানের মধ্যে একটি অর্থবহ সংযোগ তৈরি করা। বিজ্ঞানকে অনেক সময় এমন একটি দুর্বোধ্য জ্ঞানক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও শিল্পচর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন। ‘Porous Grounds’ সেই বিচ্ছিন্নতার সীমানা অতিক্রম করে শিল্প, বিজ্ঞান ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণার মধ্যে নিবিড় আলোচনা ও পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি করতে চায়।
বালুর মতো একটি সাধারণ অথচ অপরিহার্য পদার্থকে কেন্দ্র করে এই প্রদর্শনী আমাদের নতুনভাবে ভাবতে আহ্বান জানায়—আমাদের চারপাশের বস্তু ও উপাদানগুলো কীভাবে মানুষের জীবন, সমাজ, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণে ভূমিকা রাখে? আর সেই সম্পর্কগুলোকে আরও সংবেদনশীলভাবে বোঝার মধ্য দিয়ে কীভাবে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য একটি সুন্দর, ন্যায়সংগত ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব?
প্রদর্শনী: Porous Grounds
স্থান: KV – Verein für zeitgenössische Kunst Leipzig, Germany
আয়োজক: KV – Verein für zeitgenössische Kunst Leipzig এবং S.AND Research Group
সময়: ৮ নভেম্বর – ১৯ ডিসেম্বর ২০২৬









