সৌদির বিমানবন্দর কেন লক্ষ্যবস্তু, আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?

সিসিটিভি ফুটেজে সৌদি আরবের রিয়াদে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার মুহূর্তে আগুন ও ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
ইরানের বিরুদ্ধে এ বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়। পরে সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে। এরমধ্যে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেছে বেসামরিক বিমানবন্দরগুলো।
কোথাও বিমানবন্দরের অবকাঠামো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কোথাও হামলা হয়েছে বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায়, আবার কোথাও হামলার আশঙ্কায় বিমানবন্দর ও আকাশসীমা বন্ধ রাখতে হয়েছে। ফলে যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক ঘাঁটি বা তেল স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বৈশ্বিক বিমান যোগাযোগ ও বাণিজ্যেও এর বড় ধাক্কা লেগেছে।
সবশেষ রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিদের দফায় দফায় হামলা হয়েছে। এতে মোট ১৪ জন নিহত এবং চার শতাধিক আহত হয়েছে।
এ ঘটনার পর আবারও এ প্রশ্ন সামনে এসেছে, মধ্যপ্রাচ্যের এ যুদ্ধে কেন বিমানবন্দর লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে? এছাড়া আন্তর্জাতিক আইনে কী বলা হয়েছে এবং এর প্রভাব কতটুকু?
উপসাগরীয় বিমানবন্দরগুলোতে ইরানের পাল্টা হামলা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণের জবাবে ইরান উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও আবুধাবি এবং কুয়েতের বিমানবন্দর।
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি কনকোর্সে ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং চারজন আহত হন। আবুধাবির জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলার ঘটনা ঘটে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ প্রথমে একজন নিহত ও সাতজন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল, পরে ওই বিবৃতি মুছে ফেলা হয়।
কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ইরানি ড্রোন হামলায় চার বাংলাদেশি আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
একই সময়ে কাতার, বাহরাইন, জর্ডান ও কুয়েতও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের হুমকির মুখে পড়ে। তবে এসব দেশের অনেক হামলা প্রতিহত করা হয়েছিল। ফলে বিমানবন্দরের ওপর সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা দেশভেদে আলাদা ছিল।
এই হামলার তাৎক্ষণিক ফল ছিল আরও বড়। দুবাই, আবুধাবি ও দোহাসহ মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিমান চলাচল কেন্দ্রগুলো বন্ধ বা সীমিত করা হয়। ইরান, ইরাক, কুয়েত, ইসরায়েল ও বাহরাইনের আকাশপথে বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন বিমান সংস্থা ব্যাপক ফ্লাইট বাতিল ও পথ পরিবর্তন করে।
কেন এই বিমানবন্দরগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ
দুবাই ও দোহা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দর নয়; এগুলো ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যকার অন্যতম প্রধান সংযোগকেন্দ্র। এসব বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও পণ্য পরিবহন হয়।
ফলে সেখানে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের অচলাবস্থাও আঞ্চলিক সংকটকে বৈশ্বিক পরিবহন সংকটে পরিণত করতে পারে। এখানেই বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করার সামরিক যুক্তি ও বেসামরিক ক্ষতির প্রশ্নটি একসঙ্গে সামনে আসে।
এরপর সংঘাত ছড়ায় ইরান ও উপসাগরের বাইরে
যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলার চিত্র আরও জটিল হয়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর বিমানবন্দরগুলো আবারও হামলার কেন্দ্রে এসেছে।
১৩ জুলাই সৌদি আরবের আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া যায়। এর আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী হুতিদের নিয়ন্ত্রিত সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলা চালানোর কথা স্বীকার করে।
ইয়েমেনের সরকার বলেছিল, একটি ইরানি বিমানকে অবতরণ ঠেকাতেই রানওয়েতে হামলা করা হয়েছিল। বিমানটি পরে হুতিদের নিয়ন্ত্রিত হুদাইদাহ বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
অর্থাৎ বিমানবন্দর এখানে শুধু যাত্রী পরিবহনের স্থান হিসেবে নয়, সামরিক সরবরাহ, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও বিদেশি যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে।
অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়েছে। ৭ অক্টোবর সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও আবহা বিমানবন্দরে হামলার কথা জানায় সৌদি কর্তৃপক্ষ। রিয়াদের বিমানবন্দরে একজন নিহত ও আটজন আহত হন। আবহা বিমানবন্দরের ঘটনায় দুজন নিহত ও ২৮ জন আহত হন।
একই সময়ে ইয়েমেনের এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হুতিরা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন হামলা চালায়। একটি ফ্লাইট অবতরণের কয়েক মিনিট আগে একটি ক্ষেপণাস্ত্র রানওয়ের কাছে পড়ে।
এরপর ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আরও ভয়াবহ হামলা হয়। হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০০-এর বেশি মানুষ আহত হন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। হুতিরা ওই হামলার দায় স্বীকার করেছে। পরদিন আবার বিমানবন্দরের একটি টার্মিনালে হামলা হয়। এতে একজন নিহত ও ১১ জন আহত হন।
হুতিরা একই সময়ে সৌদি আরবের দাম্মাম বিমানবন্দরেও হামলা চালানোর দাবি করেছে। তবে এ ধরনের প্রতিটি দাবির ক্ষয়ক্ষতি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে ১১ অক্টোবর হুতিদের নিয়ন্ত্রিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশন দাবি করেছে, সৌদি আরব সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ তখনও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
বিমানবন্দরই কেন লক্ষ্যবস্তু
এখানে কয়েকটি সামরিক ও রাজনৈতিক কারণ কাজ করে। প্রথমত, বিমানবন্দর সামরিক ও বেসামরিক—দুই ব্যবস্থার সংযোগস্থল।
একটি বিমানবন্দর সাধারণত বেসামরিক স্থাপনা। কিন্তু একই বিমানবন্দর সামরিক উড়োজাহাজ, সেনা পরিবহন, অস্ত্র বা সামরিক সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মূল নীতি হলো—বেসামরিক স্থাপনা সরাসরি লক্ষ্য করা যাবে না। কেবল সেই স্থাপনা সামরিক লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, যা তার প্রকৃতি, অবস্থান, উদ্দেশ্য বা ব্যবহারের কারণে সামরিক কর্মকাণ্ডে কার্যকর অবদান রাখে এবং সেটি ধ্বংস বা অকার্যকর করলে নির্দিষ্ট সামরিক সুবিধা পাওয়া যায়।
তাই ‘বিমানবন্দর’ শব্দটি নিজে কোনো স্থাপনাকে বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু বানায় না। বিমানবন্দরটি কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, বিমান চলাচল বন্ধ করা নিজেই বড় সামরিক সুবিধা দিতে পারে। একটি বিমানবন্দর অচল হলে শুধু যাত্রীবাহী ফ্লাইট বন্ধ হয় না। সামরিক পরিবহন, পণ্য পরিবহন, কূটনৈতিক যাতায়াত, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সীমা আছে। কোনো স্থাপনা কেবল অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে বা জনগণের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করবে—এই কারণে সেটিকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু বানানো যায় না।
সামরিক কর্মকাণ্ডে এর বাস্তব ও কার্যকর অবদান থাকতে হবে এবং হামলা থেকে নির্দিষ্ট সামরিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি দেখাতে হবে।
আন্তর্জাতিক আইনে বিমানবন্দর কি বেসামরিক স্থাপনা?
সাধারণ অবস্থায়, হ্যাঁ। তবে, কিছু কিন্তু আছে।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে বেসামরিক স্থাপনা ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করতে হয়। সাধারণভাবে বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত বিমানবন্দর বেসামরিক স্থাপনা হিসেবে সুরক্ষা পায়। কিন্তু বিমানবন্দরের কোনো অংশ যদি সরাসরি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হয় এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তুর আইনি শর্ত পূরণ করে, তাহলে সেই অংশ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
এমনকি কোনো স্থাপনা একই সঙ্গে বেসামরিক ও সামরিক কাজে ব্যবহৃত হলেও হামলা চালানোর আগে বেসামরিক মানুষের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। হামলাকারীকে সম্ভাব্য বেসামরিক ক্ষতি কমানোর জন্য বাস্তবসম্মত সব সতর্কতা নিতে হবে। সামরিক সুবিধার তুলনায় বেসামরিক ক্ষতি অতিরিক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণেই দুবাই, আবুধাবি বা কুয়েতের মতো বিমানবন্দরে হামলার ক্ষেত্রে শুধু ‘সেখানে সামরিক উপস্থিতি ছিল কি না’—এ প্রশ্নই যথেষ্ট নয়। কোন অংশে কী সামরিক ব্যবহার ছিল, সেই ব্যবহার কতটা সরাসরি ছিল এবং হামলার সময় প্রত্যাশিত সামরিক সুবিধার তুলনায় বেসামরিক ক্ষতি কতটা ছিল—এসবও বিবেচনা করতে হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, দুবাই, আবুধাবি ও কুয়েতের বিমানবন্দরগুলো বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হলেও হামলার সময় সেখানে সামরিক লক্ষ্যবস্তু ছিল কি না, তারা তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
বেসামরিক বিমান চলাচলের আলাদা আন্তর্জাতিক সুরক্ষা আছে
এখানে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল আইনও গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও) বলেছে, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব।
১৯৪৪ সালের শিকাগো কনভেনশনের কাঠামোর অধীনে বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপদ রাখা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এপ্রিল ২০২৬-এ আইকাও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং আকাশসীমায় সামরিক তৎপরতার কারণে বেসামরিক বিমান চলাচলের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, বিমানবন্দর ও বেসামরিক উড়োজাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা ঠেকাতে আরও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অর্থাৎ যুদ্ধের সময় কোনো দেশের আকাশসীমা নিরাপত্তার কারণে বন্ধ করা এক বিষয়; আর ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক বিমানবন্দর বা বেসামরিক উড়োজাহাজকে হামলার লক্ষ্য বানানো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
বিমানবন্দরে হামলার অর্থনৈতিক প্রভাব
বিমানবন্দর হামলার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে বিমান পরিবহন ও পর্যটনে। কিন্তু এর প্রভাব সেখানেই থামে না। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমান চলাচল কেন্দ্র। এটি দীর্ঘপথের যাত্রীবাহী ফ্লাইটের পাশাপাশি বড় পণ্য পরিবহন কেন্দ্রও। ফলে বিমানবন্দর বন্ধ হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যাত্রী নয়, ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার সংযোগ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বন্ধ থাকায় বিপুলসংখ্যক ফ্লাইট বাতিল বা অন্য পথে পাঠানো হয়। এতে উড়োজাহাজের জ্বালানি খরচ বাড়ে, যাত্রা দীর্ঘ হয় এবং যাত্রীদের আটকে পড়ার ঘটনা ঘটে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় পণ্য পরিবহনের সমস্যা। দুবাই ও দোহা বৈশ্বিক পণ্য পরিবহনেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে বিমানবন্দর অচল হলে সরবরাহব্যবস্থায় অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় যোগ হয়।
সৌদি আরবের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ
সৌদি আরবের অর্থনীতি এখন শুধু তেলের ওপর নির্ভরশীল নয়। দেশটি পর্যটন, বিনোদন, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, খেলাধুলা, বিমান পরিবহন ও বিদেশি বিনিয়োগকে অর্থনীতির নতুন স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তুলছে।
এ অবস্থায় রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলা শুধু বিমান চলাচলের নিরাপত্তার সমস্যা নয়। এটি সৌদি আরবের ‘নিরাপদ বিনিয়োগ ও ব্যবসার কেন্দ্র’ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার প্রচেষ্টার ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
রিয়াদে সাম্প্রতিক হামলার পর আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও ভ্রমণ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। একই সময়ে সৌদি আরবের বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনগুলো চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক রাখার মধ্যে একটি নতুন টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাব: বিমানবন্দর এখন চাপ তৈরির হাতিয়ার
বিমানবন্দর লক্ষ্য করার আরেকটি বড় কারণ হলো এর প্রতীকী মূল্য। একটি দেশের রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলো সেই দেশের বিশ্বের সঙ্গে সংযোগের দরজা। সেখানে হামলা মানে শুধু রানওয়ে বা টার্মিনালে আঘাত নয়; এর মাধ্যমে দেখানো হয় যে প্রতিপক্ষ দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর ও অবকাঠামোও নিরাপদ নয়।
রিয়াদে সাম্প্রতিক হুতিদের হামলা এই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে। হুতিরা বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা করে সৌদি আরবকে দেখাতে চাইছে যে ইয়েমেনে সামরিক চাপের মূল্য সৌদি ভূখণ্ডেও দিতে হতে পারে।
অর্থাৎ বিমানবন্দর এখানে একটি সামরিক লক্ষ্য এবং রাজনৈতিক বার্তা—দুই ভূমিকাই পালন করতে পারে।
এর সঙ্গে ইরান-সৌদি সম্পর্কও জড়িয়ে যাচ্ছে
ইরান ও সৌদি আরব সরাসরি যুদ্ধে না থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা পুরোনো। ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত এবং ইরানের সঙ্গে হুতিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও জটিল করেছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতে হুতিদের হামলা আবারও সৌদি আরবকে সরাসরি যুদ্ধে টেনে নিচ্ছে। রিয়াদ বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক স্থাপনায় হামলা বাড়িয়েছে। এতে একটি প্রতিশোধের চক্র তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এর ফলে মূল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের পাশাপাশি ইয়েমেনের পুরোনো যুদ্ধও নতুন করে তীব্র হচ্ছে। আর ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এর প্রভাব আবার লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে পড়তে পারে।
বিমানবন্দর হামলা থেকে যুদ্ধ পরিস্থিতির কী ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে
পুরো ঘটনাপ্রবাহকে একসঙ্গে দেখলে একটি পরিষ্কার ধারা দেখা যায়। প্রথম পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়। এতে দুবাই, আবুধাবি ও কুয়েতের মতো বেসামরিক বিমান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দ্বিতীয় পর্যায়ে বিমানবন্দর বন্ধ ও আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রভাব আঞ্চলিক বিমান চলাচল থেকে বৈশ্বিক বিমান পরিবহনে ছড়িয়ে পড়ে। তৃতীয় পর্যায়ে, ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে তীব্র হলে সানা, আবহা ও পরে রিয়াদ ও এডেনের বিমানবন্দরগুলো সংঘাতের অংশ হয়ে ওঠে।
সবশেষ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, বিমানবন্দর এখন শুধু সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের লক্ষ্য নয়; প্রতিপক্ষের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, জনমনে নিরাপত্তার অনুভূতি এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর চাপ তৈরির মাধ্যমও হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিমানবন্দর বেসামরিক স্থাপনা বলেই সেটি কোনো পরিস্থিতিতেই সামরিক লক্ষ্য হতে পারে না—আন্তর্জাতিক আইন এমন সরল কথা বলে না। আবার কোনো বিমানবন্দরে সামরিক ব্যবহার আছে বলেই পুরো বিমানবন্দরকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু বানানো যায়—আইন এটাও বলে না।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরীক্ষাটি অনেক বেশি নির্দিষ্ট: কোন অংশ সামরিক কর্মকাণ্ডে কার্যকর অবদান রাখছে, সেটি ধ্বংস করলে তাৎক্ষণিক ও নির্দিষ্ট সামরিক সুবিধা কী, বেসামরিক মানুষের ক্ষতি কতটা হবে এবং ক্ষতি কমাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তর প্রতিটি হামলার ক্ষেত্রে আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়।
আর যুদ্ধের বাস্তবতায় বিমানবন্দরের গুরুত্ব আরও বড়। একটি বিমানবন্দর অচল করলে একসঙ্গে মানুষের চলাচল, পণ্য পরিবহন, পর্যটন, বিনিয়োগ, কূটনৈতিক যোগাযোগ ও রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়।
এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতে বিমানবন্দরগুলো যুদ্ধের সামরিক মানচিত্রের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মানচিত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।










