এক্সপ্লেইনার
হুতি কারা, সৌদির সঙ্গে তাদের কেন দ্বন্দ্ব

ইয়েমেনের সানায় হুতিদের ‘জনগণের সেনাবাহিনী’ গড়ে তোলার প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে আয়োজিত কুচকাওয়াজে অংশ নিচ্ছেন হুতি সমর্থকেরা। ফাইল ছবি : রয়টার্স
ইয়েমেনে আবারও হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়েছে। একদিকে হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও জ্বালানি স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে সৌদি আরব বিমান হামলা চালাচ্ছে ইয়েমেনে হুতিদের অবস্থানে।
হুতিরা মঙ্গলবার সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি শহর ও জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালায়। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব হামলায় ৭৩ জন আহত হয়েছেন। হামলা হয়েছে জিজান, আবহা, নাজরান ও খামিস মুশাইত এলাকায়। জিজানে সৌদি আরামকোর একটি তেল স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর জবাবে সৌদি আরব কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ার দিয়েছে। ইয়েমেনে হুতিদের অবস্থানেও হামলা চালিয়েছে সৌদি বাহিনী। ফলে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে বড় সংঘাতের সামনে চলে এসেছে সৌদি আরব ও ইয়েমেন।
তবে এই লড়াই শুধু সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে নয়। এর পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট, আঞ্চলিক শক্তির লড়াই এবং ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
আর হুতিরা কারা, সেটি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে কয়েক দশক আগে।
কারা এই হুতি
হুতিরা ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি বড় গোষ্ঠী। তাদের মূল ঘাঁটি সাদা প্রদেশে। ধর্মীয়ভাবে তারা জাইদি শিয়া মতের অনুসারী।
ইয়েমেনের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ শতাংশ জাইদি। তবে সব জাইদি হুতিদের সমর্থক নন।
জাইদি মতের সঙ্গে ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া মতের কিছু পার্থক্য আছে। ইরানের বেশির ভাগ শিয়া ‘টুয়েলভার’ বা ১২ ইমামের মত অনুসরণ করেন। জাইদিরা সেই মতের অনুসারী নন।
তবে সময়ের সঙ্গে ইরানের সঙ্গে হুতিদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে হুতি নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
তবে হুতিরা নিজেদের শুধু একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবে দেখে না। তারা নিজেদের ‘আনসারুল্লাহ’ নামেও পরিচয় দেয়। অর্থাৎ ‘আল্লাহর অনুসারী’।
১৯৮০-এর দশকে তাদের আন্দোলনের শুরু। তখন উত্তর ইয়েমেনে জাইদি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য তারা সংগঠিত হতে শুরু করে।
এর পেছনে আরেকটি কারণও ছিল। উত্তর ইয়েমেনে সৌদি অর্থ ও প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত সুন্নি সালাফি প্রচারকদের তৎপরতা বাড়ছিল। হুতিদের নেতারা এটিকে নিজেদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছিলেন।
২০০৪ সাল থেকে হুতিরা ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
কীভাবে সানা দখল করল হুতিরা
২০১১ সালে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। ইয়েমেনেও দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়।
সালেহ ক্ষমতা ছাড়েন। ২০১২ সালে আবদ-রাব্বু মনসুর হাদি প্রেসিডেন্ট হন।
কিন্তু নতুন সরকার দেশকে স্থিতিশীল করতে পারেনি। অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক বিভাজন ও আঞ্চলিক বিরোধ বাড়তে থাকে।
এই সুযোগে হুতিরা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে তারা রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এরপর উত্তর ইয়েমেনের বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
এটি ছিল সংঘাতের বড় মোড়।
কারণ তখন হুতিরা আর শুধু উত্তর ইয়েমেনের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী ছিল না। তারা দেশের ক্ষমতার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
২০১৫ সালের শুরুতে প্রেসিডেন্ট হাদি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। এরপর সৌদি আরব সরাসরি যুদ্ধে নামে।
কেন সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেল
সৌদি আরবের জন্য হুতিদের উত্থান ছিল বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ। ইয়েমেন সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্তে। আর হুতিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে সৌদির দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা ছিল।
রিয়াদের আশঙ্কা ছিল, ইরানের ঘনিষ্ঠ একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী তার সীমান্তের ঠিক পাশেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও এই জোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে আবার শক্তিশালী করা এবং হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো।
কিন্তু যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়নি। বরং ইয়েমেন পরিণত হয় দীর্ঘ ও ভয়াবহ এক যুদ্ধক্ষেত্রে।
সৌদি-হুতি সংঘর্ষ কতটা ভয়াবহ ছিল
যুদ্ধ শুধু ইয়েমেনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
হুতিরা সৌদি আরবের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে। সৌদি বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি, তেল স্থাপনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হয়।
২০০৯ সালেও হুতিদের সঙ্গে সৌদি বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছিল। তখন হুতিরা সৌদি সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালায়। সৌদি সেনাবাহিনী প্রথমবারের মতো সরাসরি ওই বিদ্রোহ দমনে ইয়েমেনে অভিযান চালায়।
তবে ২০১৫ সালের পর সংঘাত অনেক বড় আকার নেয়।
২০১৭ সালে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। হুতিরা হামলার দায় স্বীকার করে। সৌদি আরব ক্ষেপণাস্ত্রটি ভূপাতিত করার কথা জানায়।
সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র তখন হামলার পেছনে ইরানের হাত থাকার অভিযোগ তোলে। ইরান সেই অভিযোগ অস্বীকার করে।
২০১৮ সালে সৌদি আরবের ওপর হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও বাড়ে।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের দুটি গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার দায়ও হুতিরা স্বীকার করে। হামলায় সৌদি তেল উৎপাদন সাময়িকভাবে বড় ধাক্কা খায়। যুক্তরাষ্ট্র হামলার উৎস হিসেবে ইরানকে দায়ী করেছিল। তেহরান তা অস্বীকার করে।
অর্থাৎ হুতিরা ধীরে ধীরে এমন একটি শক্তিতে পরিণত হয়, যারা সৌদি আরবের ভেতরেও বড় ধরনের হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করে।
সালেহর সঙ্গে হুতিদের সম্পর্ক কী ছিল
ইয়েমেনের রাজনীতিতে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়।
সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহ একসময় হুতিদের সঙ্গে জোট করেছিলেন। ২০১৫ সালে তাদের সঙ্গে তার সমঝোতা হয়।
এই জোটের ফলে হুতিরা উত্তর ইয়েমেনে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়।
কিন্তু এই সম্পর্ক বেশিদিন টেকেনি।
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সালেহ হুতিদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তিনি সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করেন।
এর দুই দিন পর হুতিদের যোদ্ধারা তাকে হত্যা করে।
এই ঘটনা হুতিদের শক্তি এবং তাদের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।
তাহলে ইরান কি হুতিদের নিয়ন্ত্রণ করে
এখানেই বিষয়টি কিছুটা জটিল।
ইরান হুতিদের রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সমর্থন করে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সৌদি আরব, ইয়েমেন সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযোগ করে আসছে।
ইরান ও হিজবুল্লাহ অবশ্য হুতিদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অর্থ সহায়তার অভিযোগ অস্বীকার করেছে বা তা খাটো করে দেখিয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব বিভিন্ন সময়ে হুতিদের হাতে ইরানের তৈরি অস্ত্র পাওয়ার কথা জানিয়েছে।
তাই হুতিদের শুধু ‘ইরানের পুতুল’ হিসেবে দেখলে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যায় না।
হুতিদের নিজেদের রাজনৈতিক ও স্থানীয় স্বার্থও আছে।
তারা ইয়েমেনের ক্ষমতায় নিজেদের জায়গা চায়। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ বহু পুরনো। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক তাদের সামরিক শক্তি ও আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে সাহায্য করেছে।
২০২২ সালে কেন যুদ্ধ থেমেছিল
দীর্ঘ যুদ্ধের পর ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
এতে বড় ধরনের লড়াই অনেকটাই থেমে যায়। সৌদি আরব ও হুতিদের সীমান্তে হামলাও কমে আসে।
যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে ছয় মাস পর শেষ হলেও বড় ধরনের লড়াই আর আগের পর্যায়ে ফেরেনি। সৌদি আরবও হুতিদের সঙ্গে আলোচনার পথ খুঁজতে থাকে।
এই সময়টাকে ইয়েমেনের জন্য কিছুটা শান্তির সময় হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
কিন্তু যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হয়নি।
ইয়েমেন কার্যত ভাগ হয়েছিল। হুতিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল সানা ও উত্তর-পশ্চিমের বড় অংশ। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও তাদের মিত্ররা দেশের বিভিন্ন অংশ নিয়ন্ত্রণ করছিল।
অর্থাৎ যুদ্ধ থেমেছিল, কিন্তু মূল রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান হয়নি।
গাজা যুদ্ধের পর হুতিরা কেন বিশ্ব জুড়ে আলোচনায়
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হুতিরা আবার আলোচনায় আসে।
তারা ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার পাশাপাশি লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে।
হুতিরা বলেছিল, গাজায় ইসরায়েলি হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কিত জাহাজকে লক্ষ করবে।
এর ফলে লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। অনেক আন্তর্জাতিক জাহাজকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হয়।
হুতিদের সামরিক সক্ষমতা যে আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে, এই সময় সেটিও স্পষ্ট হয়ে যায়। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে তারা ১০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায় বলে বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে। দুটি জাহাজ ডুবে যায় এবং চার নাবিক নিহত হন।
অর্থাৎ ইয়েমেনের একটি স্থানীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সমুদ্রপথেও প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
এবার আবার সৌদির সঙ্গে সংঘর্ষ কেন
এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ বছরের জুলাই থেকে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী সানা বিমানবন্দরে হামলা চালায়। ইরান থেকে আসা একটি উড়োজাহাজ যাতে সেখানে অবতরণ করতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই হামলা চালানো হয়েছিল বলে জানানো হয়। এরপর পাল্টা হামলা বাড়তে থাকে।
এরপর হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা শুরু করে।
২০ জুলাই তারা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ ঘোষণা করে। এর জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হোদেইদাহ এলাকায় হুতিদের অবস্থানে হামলা চালায়।
গত সপ্তাহে হুতিরা আরও বড় অভিযান শুরু করে। তারা পশ্চিম তায়েজ ও দক্ষিণ হোদেইদাহ দিয়ে বাব আল-মান্দাবের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে।
বাব আল-মান্দাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
এরপর ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীও পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। তায়েজ, আল-বায়দা ও আল-জাওফে লড়াই তীব্র হয়েছে। সরকারি বাহিনী এখন সানা পুনর্দখলের লক্ষ্যও প্রকাশ্যে বলছে।
হুতিদের জন্য আল-জাওফ ও আল-বায়দা কেন গুরুত্বপূর্ণ
কারণ সানার দিকে যাওয়ার পথ অনেকটাই এই এলাকাগুলোর মধ্য দিয়ে।
আল-জাওফ সৌদি আরবের সীমান্তের কাছে। এটি হুতিদের প্রধান ঘাঁটি সাদার সঙ্গেও যুক্ত।
আর আল-বায়দা ইয়েমেনের মাঝামাঝি এলাকায়। এর সঙ্গে দেশের উত্তর ও দক্ষিণের একাধিক প্রদেশের যোগাযোগ রয়েছে।
অর্থাৎ এসব এলাকায় সরকারি বাহিনী অগ্রসর হতে পারলে হুতিদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলকে চাপের মধ্যে ফেলা সম্ভব।
আবার হুতিরা যদি দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে, তাহলে বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর তাদের চাপ বাড়বে।
এ কারণেই এই লড়াই শুধু স্থানীয় কয়েকটি শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নয়। এবার কি ২০১৫ সালের মতো।
পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ফিরছে কি
এটাই সবচেয়ে বড় আশঙ্কা। জাতিসংঘ এরই মধ্যে সতর্ক করেছে, ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেন এখন বড় ধরনের যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
তবে এখনো পরিস্থিতি ২০১৫ সালের পর্যায়ে যায়নি।
এখন পর্যন্ত বড় আকারের স্থল অভিযান এড়িয়ে চলছে দুই পক্ষ। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলাই বেশি হচ্ছে। কিন্তু যদি স্থলযুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।
আর সৌদি আরবও কঠিন এক সিদ্ধান্তের সামনে। একদিকে হুতিদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করলে সৌদির তেল স্থাপনা ও জাহাজে হামলা কমতে পারে।
অন্যদিকে বেশি ছাড় দিলে রিয়াদকে দুর্বল দেখাতে পারে।
আবার সরাসরি বড় সামরিক অভিযান শুরু করলে সৌদি আরব এমন এক দীর্ঘ যুদ্ধে ফিরে যেতে পারে, যেখান থেকে বের হতে তারা ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর চেষ্টা করেছিল।
ইয়েমেনের মানুষই সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে
সবশেষে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামরিক নয়, মানবিক।
ইয়েমেন বহু বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটগুলোর একটি মোকাবিলা করছে।
যুদ্ধের কারণে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপদ পানির সংকট এখনো তীব্র।
জাতিসংঘের হিসাবে, ইয়েমেনের অর্ধেকের বেশি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছে। প্রায় ৬০ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের কাছাকাছি অবস্থায় আছে।
এ অবস্থায় নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে।
সামনে কী হতে পারে
হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের নতুন সংঘাত এখন আর শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়।
এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ইরান। জড়িয়ে গেছে সৌদি আরবের নিরাপত্তা। জড়িয়ে গেছে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। আর বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সঙ্গে এর যোগসূত্রও তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়ার পর বাব আল-মান্দাবে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চাপ আরও বাড়তে পারে। হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব—দুটি পথই মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও বাণিজ্য পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ইয়েমেনের এই লড়াইকে শুধু ‘হুতি বনাম সৌদি’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না।
এটি এখন ইয়েমেনের পুরনো গৃহযুদ্ধ, সৌদি-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর শক্তির লড়াই—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি সংঘাত।
আর সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, ২০২২ সালে যে যুদ্ধ সাময়িকভাবে থেমেছিল, সেটি যদি আবার পুরোপুরি শুরু হয়, তাহলে ইয়েমেনকে আরও একবার দীর্ঘ ও ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে ঢুকে পড়তে হতে পারে।
তথ্যসূত্র : আলজাজিরা, রয়টার্স





