যুক্তরাষ্ট্রের টানা হামলা গড়াল এগারোতম রাতে
অব্যাহত হামলার জবাবে যুদ্ধ বাড়ানোর হুমকি ইরানের
- ইরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শহর বুশেহরেইতে হামলা
- জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বেহবাহান ও ওমিদিয়েহতে হামলা
- দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিম অংশ, হামাদান প্রদেশ, কুর্দিস্তানে জোরালো হামলা
- কুয়েতের ক্যাম্প দোহায় মার্কিন স্থাপনায় ইরানের হামলা
- জর্ডানে আইআরজিসির হামলায় তৃতীয় মার্কিন সেনা নিহতের ধারণা
- সংঘাতের আশঙ্কায় তেলের দাম বেড়েছে

ছবি: রয়টার্স
ধারাবাহিকভাবে ১১তম রাতের মতো ইরানের ওপর বোমা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরিধি বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, তাদের বাহিনীগুলো স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় থেকে টানা ১১তম রাতের মতো ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করেছে।
ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন শহরকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, বুশেহর শহরের কাছে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বুশেহরেই অবস্থিত। এতে সম্ভাব্য পরিবেশগত ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ছে। যদিও সরাসরি বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিকে লক্ষ্য করে হামলার কোনো নিশ্চিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
খুজেস্তান প্রদেশের বেহবাহান ও ওমিদিয়েহসহ অন্যান্য শহরেও বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে। ওমিদিয়েহ শহরটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের কিছু জ্বালানি অবকাঠামো এখানেই অবস্থিত।
মাহশাহর শহরেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। হরমোজগান প্রদেশে প্রাথমিকভাবে হামলার খবর পাওয়া গেলেও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো হামলা হওয়ার কথা অস্বীকার করেছে।
দক্ষিণ উপকূল থেকে অনেক দূরে ইরানের ভূখণ্ডের উত্তর-পশ্চিম অংশে অবস্থিত তাবরিজেও একই ধরনের হামলার খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের সিস্তান ও বেলুচেস্তান প্রদেশের ডেপুটি গভর্নর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহরগুলোয় হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবি হামাদান প্রদেশের ডেপুটি গভর্নরের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সর্বশেষ দফার হামলায় মার্কিন বাহিনী পশ্চিম-মধ্য হামাদান প্রদেশের কাবুদারাহাং কাউন্টিতে বিমান হামলা চালিয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, হামাদান প্রদেশের ডেপুটি গভর্নরের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন মঙ্গলবারের হামলায় মার্কিন বাহিনী পশ্চিম-মধ্য প্রদেশের কাবুদারাহাং কাউন্টিতে বিমান হামলা চালিয়েছে।
এ ছাড়া ইরাক সীমান্তবর্তী ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় ইলাম প্রদেশে বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমটি জানায়, হামলাগুলো ইলাম প্রদেশের চাভার ও আবদানান অঞ্চলে চালানো হয়েছে এবং আবদানানের গভর্নর দিনারকোহ অঞ্চলে একটি বিমান হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বুধবার ভোরে আরেক বিবৃতিতে সেন্টকম ১১তম রাতের হামলা সম্পন্ন করার কথা ঘোষণা করে।
সেন্টকম বলেছে, মার্কিন বাহিনী ইরানের সামরিক অভিযান কেন্দ্র, সামুদ্রিক সক্ষমতা, বিমান হ্যাঙ্গার, ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং সামরিক রসদ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, গত তিন মাসে ইরান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে চলাচলকারী ৩০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এই অযাচিত হামলাগুলো শত শত নিরীহ নাবিকের জীবন বিপন্ন করেছে এবং নৌচলাচলের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করেছে।
সেন্টকম দাবি করেছে, সংঘাত সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে এবং মে মাসের শুরু থেকে মার্কিন বাহিনী প্রায় ৯০০টি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ৪৫ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল চলাচলে সহায়তা করেছে।
এদিকে, এক বিবৃতিতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বলেছে, আগ্রাসনকারীকে শাস্তি দেওয়ার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বাহিনীটি ধারাবাহিক হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনা আরও জোরালো ও বড় আকারের হামলার হুমকি দিয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের সামরিক বাহিনী পশ্চিম কুয়েতের ক্যাম্প দোহায় অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে।
সংবাদ সংস্থা তাসনিমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের সামরিক বাহিনী বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বারবার আগ্রাসনের জবাবে তাদের বাহিনী ঘাঁটিটিতে থাকা গোলাবারুদের ডিপো এবং স্থলবাহিনীর কমান্ডের রসদ সরঞ্জামে হামলা চালিয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী পবিত্র ঐক্য নিয়ে শত্রুর যেকোনো নতুন ষড়যন্ত্র ও দুঃসাহসিকতার চূড়ান্ত মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। এতে ক্যাম্প দোহাকে এই অঞ্চলে মার্কিন কর্মী ও সরঞ্জামের একটি প্রধান সহায়তা কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের উদ্বেগ বাড়ায় প্রাথমিক লেনদেনে তেলের দাম সামান্য বেড়েছে।
রয়টার্সের তথ্যমতে, আজ লেনদেন শুরু হওয়ার পর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ফিউচার মূল্য ০.৫৫ শতাংশ বা ৫০ সেন্ট বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৯১.৫১ ডলারে পৌঁছেছে, অন্যদিকে স্বল্প লেনদেনের মধ্যে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ০.৩৬ শতাংশ বা ৩০ সেন্ট বেড়ে ৮৪.৬৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের হামলা আরেক মার্কিন সৈন্য নিহত হয়েছে বলে ধারণা করছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।
বিভাগটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত ১৭ জুলাই জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় তৃতীয় একজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে, ২৮ বছর বয়সী ওই সেনাসদস্যকে নিখোঁজ হিসেবে রিপোর্ট করা হয়েছিল।
জর্ডান ঘাঁটিতে হামলায় আরও দুই সেনা নিহত হয়েছেন। এই সর্বশেষ মৃত্যুর ফলে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নিহত মার্কিন সেনার মোট সংখ্যা ১৮-তে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র : আলজাজিরা




