ইসরায়েলিদের ‘কাজে লাগিয়ে’ তথ্য নিচ্ছে ইরান

তথ্য পাচারের সন্দেহে একজন আটক করার দৃশ্য । ছবি: ইসরায়েলি পুলিশ
দুই সপ্তাহ আগে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনা হয়েছে ১৪ বছর বয়সী এক ইসরায়েলি কিশোরের বিরুদ্ধে। ওই কিশোর ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিময়ে ইরানি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে বিভিন্ন কাজ করেছে বলে দাবি। প্রসিকিউটররা বলছেন, টেলিগ্রামের মাধ্যমে ওই কিশোরকে নিয়োগ দেওয়া হয় ২০২৫ সালের এপ্রিলে। একজন ইরানি এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত সে। এমনকি কিশোরের ডিজিটাল ওয়ালেটে ১ হাজার ১৭০ ডলারের বেশি পাঠানো হয়েছিল।
বিনিময়ে তেল আবিবের কিরিয়া সামরিক সদর দপ্তরের ভিডিও করা, সুরাস্কি মেডিকেল সেন্টার ও রামাত গানে ভিডিও ধারণ এবং ইরানপন্থি গ্রাফিতি আঁকার মতো কিছু কাজ করার অভিযোগ ছেলেটির বিরুদ্ধে।
গত সপ্তাহে জেরুজালেম জেলা আদালতে আলী জাবের নামে এক ইসরায়েলি নাগরিকের বিরুদ্ধেও দাখিল হয়েছে অভিযোগপত্র। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, জেনে-বুঝেও যোগাযোগ রেখেছে ইরানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে জড়িত এক বিদেশি এজেন্টের সঙ্গে। শুধু তা-ই নয়, সরবরাহ করেছে ইরানিদের উপকারে আসবে এমন তথ্য।
টেলিগ্রামে ‘জোয়ান’ ছদ্মনামের একজন খণ্ডকালীন কাজের প্রলোভনে নিয়োগ দেয় জাবেরকে। আইলাতের একটি ট্রাফিক সার্কেল ও ওভদা বিমানবাহিনীর ঘাঁটির ভেতরের ঘরের ছবি তোলার বিনিময়ে টাকা নিয়েছে জাবের। যে কি না ঘাঁটিতে কর্মরত ছিল সংস্কার শ্রমিক হিসেবে।
টার্গেটে সাবেক প্রধানমন্ত্রী!
ইরানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহে গত কয়েক সপ্তাহে গ্রেপ্তার চারজন ইসরায়েলি। এই খবর জানা গেল গত সোমবার। বিষয়টি গুরুতর নিরাপত্তা মামলা হলেও আনা হয়নি সামনে। এসব ঘটনার তদন্ত করছে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত ও পুলিশ।
গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের হয়ে ইসরায়েলিদের কাজ করার তৃতীয় প্রকাশিত ঘটনা এটি। এই মামলায় কিছু তথ্যের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা আছে। তবে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর ধারণা, তেহরানের গোয়েন্দারা তাদের সৈন্যদের সংবেদনশীল স্থাপনার ছবি তোলাসহ বিভিন্ন মিশন দিয়েছিল। পরে নিষেধাজ্ঞা আংশিকভাবে তুলে নেওয়া হলে জানা যায় চাঞ্চল্যকর তথ্য। চক্রের মূল হোতার দায়িত্ব ছিল নিজের অ্যাপার্টমেন্টে বিস্ফোরক তৈরি। সম্ভবত সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটকে হত্যার পরিকল্পনার জন্যও তাকে দেওয়া হয়েছিল প্রণোদনা।
এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং ইরানের হয়ে ইসরায়েলিদের ক্রমবর্ধমান গোয়েন্দাগিরির একটি প্রবণতা। এই পরিস্থিতি শুধু পাল্টা গোয়েন্দাগিরির জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ নয়। এটি ইসরায়েলি সমাজের অস্বস্তিকর প্রতিফলনও। কেননা এ ধরনের কাজে জড়িতদের সংখ্যা ও তাদের পরিচয়—উভয়ই নজিরবিহীন।
জড়িতদের নেই দায়বদ্ধতা
যা একসময় কট্টর আদর্শবাদী বা পেশাদার এজেন্টদের কাজ বলে মনে হতো—তা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এসব কাজে এমন নাগরিকরা জড়িয়ে পড়ছে, যাদের নেই কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শিক দায়বদ্ধতা। শুধু টাকা, কৌতূহল বা রাজনৈতিক নিষ্পৃহতার কারণে শত্রুর তথ্য সংগ্রহের কাজে জড়িয়ে পড়ছে তারা। এ কাজে ইহুদি ও অ-ইহুদি উভয়ই জড়িত।
সংখ্যার হিসাবে খুব বেশি না হলেও এর বৃদ্ধির হার চমকে দেওয়ার মতো। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এমন ডজনখানেক মামলা শনাক্ত করেছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি নাগাদ ২৫টি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে অন্তত ৪৫ সন্দেহভাজন।
প্রায় ৪০ জনের বিরুদ্ধে দাখিল হয়েছে অভিযোগপত্র। এই প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। শিন বেতের মতে, শুধু ২০২৫ সালেই ইরানের হয়ে গোয়েন্দাগিরির দায়ে অভিযুক্ত ২৫ জন। এ সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৪০০ শতাংশ বেশি। এটি শুধু গ্রেপ্তারের প্রমাণ নয়, বরং ইরানের কাঠামোগত বিস্তারের ইঙ্গিত।
পুরো সময় জুড়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ৫৪ সন্দেহভাজনকে নিয়ে প্রায় ৩৫টি গোয়েন্দাগিরির মামলা প্রকাশ্যে এনেছে। তবে এখন পর্যন্ত রায় হয়েছে খুব অল্প কয়েকজনের।
ইজি মানি, হেভি প্রাইজ
গত এক বছরে ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে অন্তত ১২০টি ইরানি গোয়েন্দা তৎপরতা চেষ্টা, যা থেকে বোঝা যায় দৃশ্যমান মামলাগুলো আসলে এক বিশাল হিমশৈলের চূড়ামাত্র। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো জড়িতদের বৈচিত্র্য। তদন্তে দেখা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে আছে ১৩ বছরের কিশোর থেকে শুরু করে আছে সৈন্য, এমনকি মধ্যবয়সী সাধারণ নাগরিকও। এটি কোনো নির্দিষ্ট আদর্শিক গোষ্ঠী নয়, বরং গণহারে নিয়োগের প্রচেষ্টা ফুটিয়ে তোলে।
এই ব্যক্তিদের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে গোয়েন্দাগিরি সম্পর্কে প্রথাগত ধারণা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে ইসরায়েলের। তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আদর্শিকভাবে ইরানপন্থি বা ইসরায়েলবিরোধী নয়। বরং তাদের মধ্যে আছে তিনটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। প্রথমত, অনেক সন্দেহভাজনকেই খুব অল্প টাকায় নিয়োগ করা হয়েছে। তারা একেকটি কাজের জন্য কয়েকশ বা কয়েক হাজার ডলার পেয়েছে কিছু ক্ষেত্রে। চিরাচরিত পেশাদার গোয়েন্দাগিরির তুলনায় এটি নগণ্য।
ইসরায়েল সরকার নিজেই এই উদ্দেশ্যে ‘ইজি মানি, হেভি প্রাইজ’ শিরোনামে শুরু করেছে জনসচেতনতামূলক প্রচার। এতে বোঝা যায় গোয়েন্দাগিরি এখন আর শুধু আদর্শ বা জবরদস্তির ওপর ভিত্তি করে চলে না। এটি এখন ‘গিগ ইকোনমি’ বা খণ্ডকালীন কাজের যুক্তিতে চলে, যেখানে কাজের চাপ কম, দায়বদ্ধতাও কম এবং বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ থাকে ধীরে ধীরে।
দ্বিতীয়ত, নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকেই সামাজিক বা অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক গোষ্ঠীর। তরুণ সমাজ, নতুন অভিবাসী বা যাদের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত। অনেকের মধ্যে সামাজিক একাত্মতার অভাব ছিল অথবা তারা অনলাইনে প্ররোচনার সহজ শিকার। ইরানি হ্যান্ডলাররা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বন্ধুবেশে যোগাযোগ করে ধীরে ধীরে তাদের মাধ্যমে সংবেদনশীল কাজ আদায় করে নেয়। শুরুতে ছবি তোলা বা প্রকাশ্য তথ্য সংগ্রহের মতো সাধারণ কাজের মাধ্যমে শুরু হলেও পরে তা রূপ নেয় গোপন মিশনে।
তৃতীয়ত এবং সম্ভবত সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হলো, অনেক সন্দেহভাজনই তাদের কাজের গুরুত্ব বা ভয়াবহতা বুঝতে পারেনি। আদালতের নথি ও প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, কেউ কেউ তাদের কাজ নিম্নস্তরের মনে করছে। যদিও তারা পাচার করছিল সামরিক ঘাঁটি, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বাড়ির তথ্য। বেসামরিক জীবন ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে এই অস্পষ্ট সীমান্তই আধুনিক ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
হাইব্রিড যুদ্ধ নাকি অন্যকিছু
ইসরায়েলি এজেন্টদের দেওয়া কাজগুলো সাধারণত খুব বেশি উন্নত প্রযুক্তির নয়। তবে কৌশলগতভাবে মূল্যবান। যেমন সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোর ছবি তোলা, শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্বদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা ইত্যাদি। তবে একটি উদ্বেগজনক মামলায় দেখা গেছে, শত শত মিশন সম্পন্ন করেছে ইসরায়েলি নাগরিকদের একটি নেটওয়ার্ক। তারা বিমান ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সরকারি স্থাপনার তথ্য সংগ্রহ করত। এটি তুলে ধরে সমসাময়িক গোয়েন্দা তৎপরতার মূল নীতি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করা হলে তুচ্ছ তথ্যও হতে পারে মূল্যবান।
ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই কৌশলটি সুযোগসন্ধানী এবং সহজে বাড়ানো সম্ভব। শুধু উচ্চশিক্ষিত এজেন্টদের ওপর নির্ভর না করে তেহরান এখন অনুসরণ করছে ‘গণনিয়োগ’ মডেল। তারা বড় জাল ফেলছে। অল্প সাফল্যের আশায় মেনে নিচ্ছে বড় ব্যর্থতা। ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা খেয়াল করেছেন, একক কোনো এজেন্টের গুণগত মানের চেয়ে সামগ্রিক তথ্য সংগ্রহের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ইরান। এই পদ্ধতি সাইবার ও হাইব্রিড যুদ্ধের বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন। প্রথাগত কাঠামোর বদলে এই ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নেটওয়ার্ক ও অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তিদের।
সামাজিক, রাজনৈতিক সংকট
যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি নাগরিকদের ইরানের হয়ে গোয়েন্দাগিরি করার বিষয়টি শুধু নিরাপত্তার ব্যর্থতা নয়, এটি একটি সামাজিক-রাজনৈতিক সংকটও বটে। প্রথমত, এটি সমাজের অভ্যন্তরীণ ফাটল, অর্থনৈতিক অসমতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও জাতীয় সংহতির অসম বণ্টনের মুখোশ খুলে দেয়।
এমনকি যুদ্ধের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া সমাজেও দেখা যাচ্ছে, নাগরিকরা সেই সংহতি সমানভাবে ধারণ করে না। দ্বিতীয়ত, এটি ডিজিটাল যুগে স্পষ্ট নৈতিক সীমানা মুছে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে। শত্রুপক্ষের কোনো গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয় সাধারণ অনলাইন আড্ডার মাধ্যমে। তখন সাধারণ আলাপ ও দেশদ্রোহীর মাঝখানের সীমারেখা খুব হালকা হয়ে যায়।
তৃতীয়ত, এটি ফুটিয়ে তোলে শাস্তির মাধ্যমে দমনের সীমাবদ্ধতা। দীর্ঘ কারাদণ্ডের ভয়ও থামাতে পারছে না এই নিয়োগ। প্রকৃতপক্ষে, এখন পর্যন্ত খুব কমসংখ্যক মামলাই চূড়ান্ত সাজার পর্যায়ে, যা ইঙ্গিত দেয় আইনি ব্যবস্থা এখনো পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
ইরানের হয়ে কাজ করা এই ইসরায়েলিরা কোনো ব্যতিক্রম নয়। তারা যুদ্ধের চিরচেনা ধরন বদলে যাওয়ারই লক্ষণ। গোয়েন্দাগিরি এখন আর শুধু ভুয়া পরিচয় নিয়ে সীমান্ত পার হওয়া অভিজাত এজেন্টদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ক্রমেই ঘরোয়া, ডিজিটাল ও স্বাধীন। যেখানে স্মার্টফোন একটি নজরদারির যন্ত্র আর সাধারণ নাগরিক হয়ে যায় সম্ভাব্য সম্পদ। তবে ইসরায়েলের মতো একটি রাষ্ট্রের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই হুমকি শুধু বাইরে থেকে নয়, বরং ভেতর থেকেও। এটি শুধু সামরিক নয়, বরং সামাজিক।
ইসরায়েলি সমাজের যখন ঐতিহ্যগত সাম্প্রদায়িক ঐক্য ও অভিন্ন রাজনৈতিক মেরূকরণ, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের চাপে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে, তখনই ঘটছে এমন ঘটনা। এ ধরনের ঘটনাগুলো শুধু নিরাপত্তার দুর্বলতাই প্রকাশ করে না। এটি সেই সামষ্টিক আদর্শকেও আঘাত করে, যা দীর্ঘকাল ধরে ইসরায়েলের শক্তির মূল উৎস।
লেখক : সল্টজম্যান ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড, কলেজ পার্কের ইসরায়েল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক
















