সুইজারল্যান্ডের বৈঠক বাতিল
মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনার সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা

সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ি রিসোর্ট বুর্গেনস্টকে এই আলোচনার সব প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত ছিল- রয়টার্স
শান্তি আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে আজ শুক্রবার বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সুইজারল্যান্ডে আয়োজিত বৈঠক শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যায়। এর মধ্যে আজ ভোরে দক্ষিণ লেবাননে লাগাতার বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। সব মিলিয়ে তেহরা-ওয়াশিংটন আলোচনার সময়সূচি নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ থামাতে সম্প্রতি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। বৈঠকের উদ্দেশ ছিল স্মারকটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপ দেওয়া।
লেবাননে নতুন করে লড়াই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় আরও জটিল হতে পারে এই শান্তি আলোচনা। হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। লেবানন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় নিহত হয়েছে অন্তত ১৮ জন। অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটির অন্যতম এক প্রাণঘাতী হামলায় তাদের চার সেনা মারা গেছে।
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি প্রেসিডেন্টের সই করা সমঝোতা স্মারকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং অন্যান্য জটিল বিষয়গুলো ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য তুলে রাখা হয়েছে। স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো অথবা এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য দুপক্ষকে সময় দেওয়া হয়েছে ৬০ দিন।
সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ি রিসোর্ট বুর্গেনস্টকে এই আলোচনার সব প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত ছিল। তবে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই বৈঠকে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেন। এর আগে বৃহস্পতিবারই তেহরান সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবফও এই বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন না।
শুধু যে জটিল বিষয়গুলোর সমাধান এখনো বাকি তা-ই নয়, বরং লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের চলমান সংঘাতও এই স্থায়ী চুক্তি অর্জনের প্রচেষ্টায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। কারণ, এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্রদের লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে এই আলোচনা থেকে বাদ পড়া ইসরায়েল সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই চুক্তির কোনো পক্ষ নয়। চলতি সপ্তাহের শুরুতে লেবাননে সহিংসতা কিছুটা কমলেও পরে তা আবার বেড়ে গেছে।
বৈঠক স্থগিতের ঘোষণা সুইজারল্যান্ডের
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত অন্তত ৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। যাদের সিংহভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক। এ যুদ্ধে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। তবে চলতি সপ্তাহে তেলের দাম কিছুটা কমেছে। পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল শুরু হওয়ায় বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা দেখা গেছে।
চলতি সপ্তাহের চুক্তির মাধ্যমে ভঙুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অন্তত ৬০ দিন বাড়ানোর পর ইরান জানিয়েছে, তারা আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র বৃহস্পতিবার রাতে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, আলোচনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়া মাত্রই জেডি ভ্যান্স এবং মার্কিন প্রতিনিধি দল রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘তবে এ ধরনের আলোচনার রসদ কখনোই সহজ কিংবা আগে থেকে অনুমান করা যায় না।’ এ বিষয়ে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আলোচনাটি আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। তবে সুইজারল্যান্ড এই আলোচনা ফলপ্রসূ করতে এখনো প্রস্তুত। আলোচনার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজও অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা সুইজারল্যান্ডে এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করার কথা বলেছে। তবে এই পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের মতে, দুই দেশের প্রেসিডেন্ট এরই মধ্যে চুক্তিতে সই করায় এমন আনুষ্ঠানিকতার কোনো প্রয়োজন নেই।
এদিকে ওয়াশিংটনে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেসের কিছু সহযোগী প্রশ্ন তুলেছেন। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই যুদ্ধ থামাতে ট্রাম্প ইরানকে অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছেন কি না। অথচ গত মার্চেই ট্রাম্প প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া তিনি এই যুদ্ধ থামাবেন না।
তবে এর বিপরীতে ইরানের সঙ্গে সই হওয়া এই স্মারকের মাধ্যমে দেশটির ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হচ্ছে। শত শত কোটি ডলারের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থেকেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেছেন, ট্রাম্প একেবারে মরিয়া হয়ে এই চুক্তিতে সই করেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আসন্ন আলোচনা মোটেও সহজ হবে না। এটি ছিল যুদ্ধ শুরু করার অন্যতম প্রধান অজুহাত। এক বার্তায় তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘মার্কিন পক্ষ যদি অতিরিক্ত দাবি খাটাতে চায়, তবে আমরা তা মেনে নেব না।’
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলও জোর দিয়ে বলেছে, দেশের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখানো হবে না।
এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, মেয়াদ বাড়ানো না হলে আলোচকরা ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে এবং ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল ও অন্যান্য আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিত করতে ৬০ দিন সময় পাবেন। অন্যদিকে জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের চেষ্টাও করবে।
যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের বিষয়টিও এখন সামনে চলে এসেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যমতে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) কংগ্রেসকে জানিয়েছে, এই যুদ্ধের খরচ এবং অন্যান্য কিছু অনুষঙ্গিক বিল মেটাতে তাদের জরুরি ভিত্তিতে ৮০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।
অবশ্য মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এই আলোচনা থেকে এখনো ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একটি শক্তিশালী চুক্তি বেরিয়ে আসতে পারে। যা ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তির চেয়েও কার্যকর হবে। চুক্তিটি ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে বাতিল করেছিলেন।







