হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের অভিযোগের পরেই নবান্ন থেকে বদলির নির্দেশ
আসসালামু আলাইকুম বলাতেই কি মুসলিম নারী আইপিএসকে বদলির নির্দেশ

ভারতে ২০২১ ব্যাচের এই আইপিএস কর্মকর্তা বাশরা বানো
খড়্গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বুশরা বানোকে বদলি ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ১৪ সেপ্টেম্বর, সোমবার, ২০২১ ব্যাচের এই আইপিএস কর্মকর্তাকে পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের পদ থেকে সরিয়ে রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের চতুর্থ ব্যাটালিয়নের ডেপুটি কমান্ডান্ট করা হয়। তার জায়গায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসাবে দায়িত্ব নেবেন পার্থ ঘোষ। নবান্নের তরফে এই বদলিকে রুটিন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বলা হলেও, তার ঠিক আগে বুশরার একটি ভিডিও ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের কারণে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিতর্কের সূত্রপাত হয়, ১৩ সেপ্টেম্বর সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও নিয়ে। পুলিশি উর্দিতে থাকা বুশরা সেখানে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক কোচিং অ্যাকাডেমির কথা বলেন। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ওই প্রতিষ্ঠান তাকে কীভাবে সাহায্য করেছিল, সেই অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন তিনি। বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন ‘আসসালামু আলাইকুম’, কথার মাঝে ব্যবহার করেন ‘ইনশাল্লা’ এবং শেষে বলেন ‘জাজাকাল্লাহ’। এই শব্দগুলিই পরে বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।
হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘হিন্দু লিগ্যাল ফান্ড’ সমাজমাধ্যমে ভিডিওটির ওইসব অংশ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলে, সরকারি পোশাকে এবং নিজের পদ উল্লেখ করে কোনও আধিকারিক কেন এই ধরনের ধর্মীয় সম্ভাষণ ব্যবহার করবেন। তাদের আরও প্রশ্ন, ‘জয় হিন্দ’ বা ‘বন্দে মাতরম্’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করা হয়নি কেন। সংগঠনটি পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্রসচিবের কাছে বুশরার বিরুদ্ধে অভিযোগও দায়ের করেছে।
এই ঘটনাতেই বিতর্কের মূল প্রশ্নটি সামনে এসেছে। একজন মুসলিম মহিলা পুলিশ আধিকারিক নিজের বক্তব্যে নিজের ধর্মীয় সংস্কৃতিতে প্রচলিত সম্ভাষণ ব্যবহার করলেই কি তার সরকারি নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়ে? তার বিরুদ্ধে কোনও প্রশাসনিক বা পুলিশি কাজের নির্দিষ্ট অভিযোগের বদলে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে কয়েকটি ধর্মীয় শব্দ। ফলে সমালোচকদের একাংশের প্রশ্ন, একজন আধিকারিকের কাজের মূল্যায়নের জায়গায় কি তার ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে আনা হচ্ছে?
বুশরা বানোর জীবনের দিকে তাকালে ছবিটা আরও অন্যরকম। উত্তরপ্রদেশের কন্নৌজের বাসিন্দা বুশরা আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পিএইচডি এবং নেট- জেআরএফ করার পর সৌদি আরবে সহকারী অধ্যাপকের চাকরি নেন। প্রতিষ্ঠিত সেই চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে তিনি আবার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন। সংসার এবং দুই সন্তানের দায়িত্ব সামলেও থামেননি তার চেষ্টা। ২০১৮ সালে ইউপিএসসি পরীক্ষায় ২৭৭ নম্বর স্থান অর্জন করেন বুশরা। ভারতীয় রেল ট্রাফিক পরিষেবায় সুযোগ পাওয়ার পরও তার লক্ষ্য বদলায়নি। প্রশাসনিক চাকরির অভিজ্ঞতার পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশে মহকুমাশাসক হিসাবেও কাজ করেন তিনি। পরে আবারও ইউপিএসসি পরীক্ষায় বসে ২৩৪ নম্বর স্থান অর্জন করেন এবং ভারতীয় পুলিশ পরিষেবায় নির্বাচিত হন।
২০২১ ব্যাচের আইপিএস হিসাবে পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারে যোগ দেন তিনি। প্রথমে হুগলি গ্রামীণ এলাকায় সহকারী পুলিশ সুপার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৬ সালে পদোন্নতির পর দায়িত্ব পান খড়্গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসাবে। দুই সন্তানের মা হয়েও পর পর দু’বার দেশের অন্যতম কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য পাওয়া বুশরার এই দীর্ঘ লড়াই এক সময় তাকে প্রশংসা এনে দিয়েছিল। কিন্তু আজ তার পরিচয়ের সামনে যেন তার সেই সাফল্যই চাপা পড়েছে। তার বক্তব্য ছিল মূলত অন্যদের, বিশেষ করে সংখ্যালঘু, মহিলা এবং পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এগিয়ে আসার উৎসাহ দেওয়ার বিষয়ে।
অথচ বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে তিনি কী সম্ভাষণ ব্যবহার করেছেন। বুশরাকে ঘিরে পাল্টা প্রতিক্রিয়াও এসেছে। ‘মুসলিম আইটি সেল’ নামে একটি সমাজমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের অভিযোগ, সংখ্যালঘু হওয়ার কারণেই তাকে নিশানা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, আচমকা তার বদলি নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। যদিও নবান্নের বক্তব্য, বদলি রুটিন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত।
ফলে এই ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখনও রয়ে যাচ্ছে- একজন মহিলা আইপিএস অফিসারের প্রশাসনিক দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং দীর্ঘ সংগ্রামকে কি তার ধর্মীয় সম্ভাষণের মাপকাঠিতে বিচার করা হবে? নাকি একজন ভারতীয় পুলিশ আধিকারিকের মূল্যায়ন হবে তার কাজ, দায়িত্ববোধ এবং কর্মদক্ষতা দিয়ে? বুশরা বানোকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক সেই প্রশ্নই আরও জোরালো করে তুলেছে। কলকাতার বিখ্যাত মৌলনা আবুল হাসান আলী বলেন, ' এটা খুব হতাশাজনক বিষয়। একজন আইপিএস অফিসার শুধুমাত্র মুসলিম হওয়ার কারণে তাকে নিশানা করা হচ্ছে।'



