মেঘালয়ের বৃষ্টির দেশেই কেন শুকোচ্ছে ঝরনা

সংগৃহীত ছবি
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাসি পাহাড় জেলায় অবস্থিত মাওসিনরামের নাম শুনলেই প্রথমে মনে পড়ে বৃষ্টির কথা। পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপাত ও আর্দ্র স্থান হিসেবে পরিচিত এটি। বর্ষায় সোহরার পাহাড়ি পথে বেরোলেই চোখে পড়ে ছোট-বড় অসংখ্য ঝরনা। পাহাড়ের গা বেয়ে জল নেমে আসে, চারপাশে যেন জলেরই শব্দ। কিন্তু সেই মাওসিনরাম-সোহরাতেই এখন অন্য এক ছবি চোখে পড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই কয়েকটি ঝরনায় জল কমতে শুরু করেছে। আর গবেষণা বলছে, আগামী দিনে এই বৃষ্টির দেশেই বাড়তে পারে খরার ঝুঁকি।
মাওকিসিয়েমের বাসিন্দা পি হুজোন একটি অতিথিশালা চালান। তার চোখে বদলটা ধরা পড়ছে। তার কথায়, সোহরার কয়েকটি ঝরনা এ বার সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই শুকোতে শুরু করেছে। আগে যে দৃশ্যটা বর্ষা পেরিয়ে শীতের দিকে দেখা যেত, এখন তার আগেই জলধারা কমে আসছে। স্থানীয় মানুষের এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে সাম্প্রতিক গবেষণার ছবিও।
‘থিওরেটিক্যাল অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড ক্লাইমাটোলজি’ পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণাটি বলছে, মেঘালয়ে শুধু বৃষ্টির পরিমাণ নয়, বদলে যাচ্ছে বৃষ্টির ধরনও। বৃষ্টির দিন কমছে। কিন্তু যে দিন বৃষ্টি হচ্ছে, সেই দিনেই অল্প সময়ে অনেক বেশি জল নেমে আসছে। ফলে একটানা বৃষ্টির বদলে প্রবল বর্ষণের পর্ব বাড়ছে।
আশেষ রুদ্র পাল এবং পঙ্কজ কুমার রায় ১৯৮১ থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত মেঘালয় ও আশপাশের এলাকার জলবায়ু এবং জলপ্রবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তাতে দেখা গিয়েছে, বছরে বৃষ্টির দিনের সংখ্যা গড়ে ০.৪ দিন করে কমছে। অন্যদিকে, যে দিন বৃষ্টি হচ্ছে, সেই দিনের বৃষ্টির গড় তীব্রতা বাড়ছে।
শুনতে বিষয়টি পরস্পরবিরোধী মনে হতে পারে। বৃষ্টি কমছে না, অথচ খরার ভয় কেন? উত্তরটা লুকিয়ে আছে বৃষ্টির ধরনে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধিও সেই চাপ বাড়াচ্ছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মেঘালয়ের কোনও কোনও এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বছরে সর্বোচ্চ ০.০৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। তাপমাত্রা বাড়লে মাটি ও গাছপালা থেকে জল দ্রুত বাষ্প হয়ে বেরিয়ে যায়। বৃষ্টি থামার পর মাটির আর্দ্রতাও তাই দ্রুত কমে যেতে পারে।
গবেষকরা বৃষ্টিপাত ও বাষ্পীভবনের হিসাব মিলিয়ে খরার প্রবণতা বিশ্লেষণ করেছেন। উচ্চ মাত্রায় উষ্ণায়ন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে মাঝারি, তীব্র এমনকি চরম খরার ঘটনাও বাড়তে পারে বলে গবেষণার পূর্বাভাসে উঠে এসেছে।
শুধু মাটির জল নয়, নদীর জলপ্রবাহ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। গবেষণার জলপ্রবাহের হিসাব অনুযায়ী, দূর ভবিষ্যতে সারি-গোয়াইন অববাহিকায় বার্ষিক গড় জলপ্রবাহ সর্বোচ্চ ৯.৮ শতাংশ এবং সুরমা-মেঘনা অববাহিকায় ১১.৬ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। বর্ষায় নদী ফুলে উঠলেও বছরের শেষ দিকে জলপ্রবাহ দ্রুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে গবেষণারও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বন উজাড়, নগরায়ণ, জমির ব্যবহার বদল এবং ভূগর্ভস্থ জল তোলার মতো মানুষের কর্মকাণ্ড এই হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি। স্থানীয় স্তরে এই কারণগুলির প্রভাব যোগ হলে জলপ্রাপ্যতার পরিস্থিতি আরও বদলাতে পারে।
মাওসিনরাম-সোহরার পাহাড়ে হয়তো সেই বদলের ছোট ছোট চিহ্ন ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। যে জায়গাকে এত দিন পৃথিবীর বৃষ্টির রাজ্য বলে চেনা হয়েছে, সেখানে বর্ষা শেষ হওয়ার আগেই যদি ঝরনা শুকিয়ে যেতে শুরু করে, তা হলে সেই দৃশ্য শুধু স্থানীয় জলের সংকটের কথা বলে না। জলবায়ু বদলে গেলে বৃষ্টির দেশেও যে জলের হিসাব নতুন করে লিখতে হতে পারে, তারও ইঙ্গিত দেয়।




