ভারতের মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি চালকদের কেন মারাঠি শিখতে হচ্ছে

ভারতের মহারাষ্ট্রের পরিবহন কর্মকর্তারা চালকদের সরকারি ভাষা মারাঠিতে সাধারণ কথাবার্তা বলার দক্ষতা পরীক্ষা শুরু করেছিলেন। ছবি: সংগৃহীত
ভারতের মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোচালকদের স্থানীয় মারাঠি ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। ভাষা না জানলে লাইসেন্স স্থগিতসহ ছিল বাতিলের ঝুঁকিও। তবে প্রতিবাদের মুখে চালকদের আরও এক বছর সময় দিয়েছে রাজ্য সরকার।
গত ২০ আগস্ট থেকে পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্রে পরিবহন কর্মকর্তারা চালকদের মারাঠিতে মৌলিক কথোপকথনের সক্ষমতা পরীক্ষা শুরু করেন। যারা পরীক্ষায় ব্যর্থ হন, তাদের ভাষা শেখার জন্য এক মাস সময় দেওয়া হয়েছিল। এরপরও ভাষা শিখতে না পারলে তাদের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার কথা ছিল।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চালক ও যাত্রীদের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করা এবং নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতেই এই নিয়ম চালু করা হয়েছে।
তবে নিয়মটি নিয়ে চালকদের সংগঠনগুলো প্রতিবাদ জানায়। তাদের দাবি, ভাষা শেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করা হলে চালকদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। মহারাষ্ট্রে কাজ করা অনেক চালকই ভারতের অন্য রাজ্য থেকে আসা অভিবাসী। তাদের মধ্যে আছেন হিন্দিভাষী উত্তর প্রদেশ ও বিহারের বাসিন্দাও।
চালকদের বিক্ষোভে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিস গত সপ্তাহে ঘোষণা দেন, চালকদের মারাঠি শেখার জন্য আরও এক বছর সময় দেওয়া হবে। অনেক চালক দীর্ঘদিন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকায় ভাষা শেখার জন্য তাদের আরও সময় প্রয়োজন।
রাজ্যের পরিবহনমন্ত্রী প্রতাপ সরনায়েক জানিয়েছেন, এই এক বছরের মধ্যে চালকদের মারাঠি শিখতে হবে। এরপর আর কোনো সময় বাড়ানো হবে না।
মহারাষ্ট্রে বৈধ ট্যাক্সি ও অটোরিকশার পারমিট আছে প্রায় ৯ লাখ ৭৯ হাজার। এর প্রায় অর্ধেকই মুম্বাই মহানগর এলাকায়।
সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন চালকরা। মুম্বাইয়ের ট্যাক্সিচালক লাখান পান্ডে জানিয়েছেন, লাইসেন্স স্থগিত হলে তাদের দৈনিক আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। এখন তারা কিছুটা স্বস্তি বোধ করছেন।
তবে এই সিদ্ধান্ত মহারাষ্ট্রে ভাষা, অভিবাসন ও কর্মসংস্থান নিয়ে পুরনো বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে। সাংবাদিক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশ আকোলকারের মতে, বিষয়টি শুধু চালক ও যাত্রীদের মধ্যে যোগাযোগের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে মারাঠি পরিচয়, অভিবাসন ও কর্মসংস্থানের বিষয়ও জড়িত।
মহারাষ্ট্র রাজ্যটি ১৯৬০ সালে দীর্ঘ আন্দোলনের পর মারাঠিভাষী মানুষের জন্য গঠিত হয়। এরপর মুম্বাই ভারতের অন্যতম প্রধান আর্থিক কেন্দ্রে পরিণত হলে কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে আসতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে ভাষার বিষয়টি মারাঠিভাষীদের কর্মসংস্থান ও সুযোগ-সুবিধার দাবির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
১৯৬৬ সালে মারাঠি জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল শিবসেনা প্রতিষ্ঠিত হয়। দলটি ভূমিপুত্র নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে অভিযোগ করে আসছিল, অভিবাসীদের কারণে মারাঠিভাষীরা চাকরি হারাচ্ছেন। পরে দলটি মহারাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। মারাঠি পরিচয় হয়ে ওঠে তাদের রাজনীতির অন্যতম প্রধান বিষয়।
বর্তমানে ফড়নবিসের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও শিবসেনার একটি অংশের জোট মহারাষ্ট্রের সরকার পরিচালনা করছে। ২০২২ সালে শিবসেনা দুই ভাগে বিভক্ত হয়। দলটির অন্য অংশ এবং আরেক আঞ্চলিক দল মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনাও (এমএনএস) মারাঠি ভাষার পক্ষে সরব।
প্রকাশ আকোলকার মনে করেন, কোনো রাজ্যে বসবাস ও কাজ করতে এলে স্থানীয় ভাষার কিছুটা জ্ঞান অর্জনের প্রত্যাশা করা স্বাভাবিক। তবে ভাষাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়টি আলাদা। তার মতে, সাধারণ মানুষ ভাষার বিষয়টিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মতো তীব্রভাবে দেখে না। রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী দলগুলো অনেক সময় ভাষার বিষয়টি সামনে আনে।
তবে মারাঠি ভাষা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান মারাঠি অধ্যয়ন কেন্দ্রের সভাপতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দীপক পাওয়ারের অবস্থান আরও কঠোর। তার মতে, যারা বছরের পর বছর মহারাষ্ট্রে বসবাস ও কাজ করছেন, তাদের অন্তত মৌলিক মারাঠি জ্ঞান থাকা উচিত। দীর্ঘদিন রাজ্যে বসবাসের পরও স্থানীয় ভাষা শিখতে অস্বীকৃতি জানানোকে তিনি অন্য ভাষাকে অবজ্ঞা করা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
একই ধরনের বিতর্ক ভারতের কর্ণাটকসহ অন্যান্য রাজ্যেও রয়েছে। সেখানে ভাষাকর্মীদের আশঙ্কা, হিন্দি ও ইংরেজি ব্যবহার করেই চলা সম্ভব মনে করায় অভিবাসীদের কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে স্থানীয় ভাষা কন্নড়।
মহারাষ্ট্র সরকার জানিয়েছে, চালকদের মারাঠি পড়তে বা লিখতে কিংবা সাবলীলভাবে বলতে হবে না। রাজ্যের মোটরযান বিধিমালায় সংশোধন এনে শুধু মারাঠিতে ‘কাজ চালানোর মতো জ্ঞান’ থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
চালকদের ভাষা শেখাতে সরকার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। সেখানে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মারাঠি শব্দ ও বাক্য শেখানো হয়। যেমন যাত্রী কোথায় যাবেন, ভাড়া নিয়ে কথা বলা কিংবা পথ নির্দেশনা দেওয়ার মতো বিষয়।
রাজ্যের পরিবহন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ লাখ ৬৬ হাজার চালক প্রশিক্ষণ শেষ করে মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।
মুম্বাইয়ের কাছে থানের একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ৫৮ বছর বয়সী অটোরিকশাচালক মুনাওয়ার শেখও এমন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। চার দিনের প্রশিক্ষণে তিনি ও অন্য চালকরা বেশি ব্যবহৃত শব্দ ১৬টি প্রশ্ন ও বাক্য শিখেছেন। এর মধ্যে ছিল ‘আপনি কোথায় যাবেন?’, ‘চিন্তা করবেন না’ এবং ‘মিটারের হিসাবে ভাড়া হবে’ ধরনের বাক্য।
প্রশিক্ষণ শেষে চালকদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। উত্তীর্ণরা একটি সনদ পান। পরিবহন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের সময় তারা এই সনদ দেখাতে পারেন।
মুনাওয়ার জানিয়েছেন, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যাত্রীদের সঙ্গে মৌলিক কথোপকথন চালানোর মতো মারাঠি তিনি শিখেছেন।
তবে অনেক চালকের জন্য ভাষা শেখার সময় বের করাই বড় সমস্যা। মুম্বাইয়ের ট্যাক্সিচালক অজয় সিং জানিয়েছেন, তিনি মারাঠি শিখতে চান। কিন্তু কর্মঘণ্টার সঙ্গে প্রশিক্ষণের সময় মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তার ভাষ্য, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গাড়ি চালাতে হয়। না হলে সংসারে খাবার জোটে না। দিনের কয়েক ঘণ্টা প্রশিক্ষণে দিলে আর্থিকভাবে তা সামলানো কঠিন।
অজয় প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার রুপি বা বাংলাদেশের টাকায় ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা আয় করেন। কয়েক দিনের আয় বন্ধ হয়ে গেলেই বাড়িভাড়া ও সন্তানদের স্কুলের ফি দিতে সমস্যায় পড়তে হবে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
তাই প্রশিক্ষণে সময় দেওয়ার পরিবর্তে গাড়ি চালানোর সময়ই মারাঠি শেখার চেষ্টা করছেন তিনি। গাড়ি চালানোর সময় মারাঠি রেডিও শোনেন এবং মারাঠিভাষী যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলার মাধ্যমে ভাষাটি অনুশীলন করেন।
লাখান পান্ডে জানিয়েছেন, অতিরিক্ত এক বছর সময় পাওয়ায় তাদের জন্য বিষয়টি অনেক সহজ হয়েছে। মারাঠি শেখার বিষয়ে তার কখনো আপত্তি ছিল না। শুধু পর্যাপ্ত সময় চেয়েছিলেন তিনি।
তার ভাষ্য, ‘আমরা এখানে থাকি, এখানে কাজ করি। অবশ্যই আমাদের মারাঠি শেখা উচিত। শুধু আমাদের জীবিকা ঝুঁকিতে না ফেলে ভাষাটি শেখার জন্য সময় দেওয়া হোক।’
সূত্র: বিবিসি






