কেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা প্রশ্নপত্র ভাইরাল?

সংগৃহীত ছবি
সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক স্তরের প্রবেশিকা পরীক্ষার একটি প্রশ্নপত্র। প্রশ্নগুলির ধরন দেখে অনেকেই বিস্মিত। কারণ সেখানে প্রচলিত অর্থে পাঠ্যবইভিত্তিক প্রশ্নের বদলে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শিক্ষার্থীদের কল্পনাশক্তি, অনুভূতি ও স্বাধীন চিন্তাকে।
প্রশ্নপত্রের ২৫ নম্বরের অংশে এমন কয়েকটি বিষয় দেওয়া হয়েছিল, যা উত্তর দিতে গেলে শুধু তথ্য জানলেই হবে না, প্রয়োজন হবে নিজের মতো করে ভাবার ক্ষমতা। প্রশ্নগুলির মধ্যে ছিল- ‘তোমার ছোটবেলার ইচ্ছাগুলো ও খামখেয়ালিগুলো’, ‘কেটে ফেলা হচ্ছে যে জঙ্গল, সেই জঙ্গলের পাখিদের কথোপকথন’, ‘প্রিয়জনকে উপহার দিতে চাওয়া একটি বই’, ‘বৈকুণ্ঠ মল্লিক, লালমোহন গাঙ্গুলি ও সত্যজিৎ রায়ের সাহিত্য-আড্ডা’, কিংবা ‘ঈশ্বরকে কয়েকটি প্রশ্ন করার সুযোগ পেলে কী জানতে চাইতে’।
এই ধরনের প্রশ্ন সাধারণ পরীক্ষার খাতায় সচরাচর দেখা যায় না। আবার একে পুরোপুরি পাঠ্যসূচির বাইরের প্রশ্ন বলেও চিহ্নিত করা কঠিন। কারণ এগুলি মূলত মানুষের প্রতিদিনের জীবন, অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও চিন্তার জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রশ্নপত্রটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ মনে করছেন, এমন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ নয়। আবার অনেকের বক্তব্য, যারা শুধু মুখস্থনির্ভর পড়াশোনায় অভ্যস্ত, তাদের কাছেই প্রশ্নগুলি কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু নিজের ভাবনা প্রকাশের সুযোগ হিসেবে দেখলে এই ধরনের প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
শিক্ষাবিদ, ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ মানুষের মতে, স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজজীবনে প্রবেশ করতে যাওয়া তরুণ-তরুণীদের কল্পনাশক্তি কতটা বিস্তৃত, তারা কীভাবে পৃথিবীকে দেখে এবং নিজেদের অনুভূতি কতটা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে, সেই বিষয়গুলিই যাচাই করার চেষ্টা রয়েছে এই প্রশ্নপত্রে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপকদের বক্তব্যও সেই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাদের মতে, কোনো শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে এলে সে সবকিছু জেনে আসবে এমন প্রত্যাশা করা হয় না। বরং স্বাধীনভাবে ভাবার ক্ষমতা এবং সেই ভাবনাকে ভাষায় প্রকাশ করার দক্ষতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মৌলিক চিন্তার ভিত শক্ত হলে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও পাঠ শিক্ষার্থীদের শেখানো সম্ভব।
অধ্যাপকদের আরও বক্তব্য, পরীক্ষার খাতায় নোট মুখস্থ করে লিখে দেওয়ার সংস্কৃতির বাইরে এসে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাকে গুরুত্ব দেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য। কোনো চাপ সৃষ্টি না করে, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের ছাত্রছাত্রীরা যাতে নিজেদের মনের কথা সহজভাবে প্রকাশ করতে পারে, সেই সুযোগ করে দিতেই এই ধরনের প্রশ্ন রাখা হয়েছে।
এই কারণেই প্রশ্নপত্রটি শুধু পরীক্ষার্থীদের মধ্যেই নয়, বৃহত্তর সমাজেও সাড়া ফেলেছে। অনেকের মতে, শিক্ষা যদি মানুষের চিন্তা, কল্পনা ও সৃজনশীলতাকে বিকশিত করার মাধ্যম হয়, তাহলে এই ধরনের প্রশ্নপত্র সেই লক্ষ্য পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আর সেই কারণেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এই প্রবেশিকা প্রশ্নপত্র এখন সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
যাদবপুরের পড়ুয়া সীমন্তিনী সাহা বলেছেন, এ ধরনের প্রশ্নে নাম্বারের জন্য মুখস্থ উত্তর লেখার সুযোগ নেই। নিজের মতো করে ভাবতে হয়। তাই পরীক্ষা অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। উত্তরবঙ্গের অধ্যাপক সজল সরকারের মতে, ভাষা বা সাহিত্য নিয়ে পড়তে চাইলে কল্পনাশক্তি ও ভাবপ্রকাশের ক্ষমতা জরুরি। সেই দক্ষতা যাচাইয়ের চেষ্টা এই প্রশ্নগুলোয় দেখা যাচ্ছে।




