ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থায় আস্থা ফেরাতে আসা এনটিএ নিজেই আস্থা সংকটে

সংগৃহীত ছবি
বছরের পর বছর প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রশাসনিক ত্রুটি ও নকলের অভিযোগে আস্থা হারিয়েছিল ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থা। পরে একে আরও কার্যকর, সুশৃঙ্খল ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে ২০১৭ সালে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) চালু করে দেশটি। তবে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি মাত্র আট বছরের ব্যবধানে নিজেই পড়েছে আস্থার সংকটে।
প্রতিষ্ঠার পর এনটিএ ভারতের সবচেয়ে বড় ও প্রতিযোগিতামূলক কিছু পরীক্ষার দায়িত্ব নেয়। এর মধ্যে ছিল মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং শিক্ষকতা ও গবেষণার যোগ্যতা নির্ধারণী পরীক্ষা। তবে বিভিন্ন সময় নানা অসঙ্গতি, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে সংস্থাটি।
গত জুন মাসে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার (এনইইটি-ইউজি) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় উত্তাল হয়ে ওঠে ভারত। ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ চলে কয়েক সপ্তাহ ধরে। শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
এর পরিপ্রেক্ষিতে পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার এবং মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের সুপারিশ করতে প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করে সরকার।
তবে অনেক ভারতীয়ের কাছে একটি নতুন কিছু না। ২০২৪ সালে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়মের ঘটনায় বিক্ষোভের পর একই ধরনের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। প্রতিবেদন বলছে, ওই কমিটির করা ১০০ সুপারিশের অর্ধেকের বেশি কার্যকর করা হয়েছে। তারপরও ২০২৬ সালে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটি শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এনটিএর জবাবদিহি ও সক্ষমতা থেকে শুরু করে পরীক্ষার কেন্দ্রীয়করণ, কাঠামো এবং ভারতের উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আছে কি না, সেটিও সামনে এসেছে।
২০২৪ ভারত সরকারের করা কমিটিতে ছিলেন এসজিটি ইউনিভার্সিটির প্রধান বিজে রাও। তিনি জোর দিলেন কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষার ওপর। তার ভাষ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি কমাতে, দক্ষতা বাড়াতে এবং মানুষের সম্পৃক্ততা যথাসম্ভব কমাতে ভারতকে কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষার দিকে এগোনো উচিত।
বিজে রাও বলছিলেন, ‘দেশ জুড়ে ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে। এখন আমাদের অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ ও গুরুত্ব দিতে হবে এবং কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষায় যেতে হবে।’
‘বর্তমানে আমরা পরীক্ষার জন্য অস্থায়ী কেন্দ্র ব্যবহার করি। এগুলোর পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকা মানসম্মত অনলাইন কেন্দ্র তৈরি করতে হবে’, যোগ করেন তিনি। তবে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই সমস্যার সমাধান হবে, তেমনটা মনে করেন না তিনি।
ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এনটিএর ২২১ কর্মীর মধ্যে মাত্র ২৪ জন স্থায়ী। বাকিরা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। এই চুক্তিভিত্তিক কর্মীর ওপর নির্ভরতাকে এনটিএর একটি বড় সমস্যা বলেও তুলে ধরলেন এই বিশেষজ্ঞ।
তিনি ব্যাখ্যা দিলেন, ‘যখন একটি প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ কর্মী অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করেন, তখন প্রতিষ্ঠানের প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতা বা সম্পৃক্ততার অনুভূতি থাকে না। এর প্রভাব কাজের ওপরও পড়ে। ভালো ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিশ্চিত করতে এমন লোক প্রয়োজন, যারা শিক্ষা খাত সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন এবং এ ধরনের মূল্যায়ন পরিচালনায় অভিজ্ঞ।’
চলতি বছর বিক্ষোভের সূত্রপাত যে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষাকে ঘিরে, সেটিকে ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষার আদলে পরিবর্তন করা যেতে পারে বলে মত দিলেন শিক্ষাবিদ ও এডুকেটরস ফেডারেশনের সভাপতি কেশব আগরওয়াল। ভারতে ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষা কম্পিউটারভিত্তিক এবং দুই ধাপে অনুষ্ঠিত হয়।
কেশব আগরওয়াল বলছিলেন, একদিনের একটি উচ্চঝুঁকির পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে একাধিক ধাপে এই পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে, যেখানে প্রতিটি ধাপে ভিন্ন প্রশ্নপত্র থাকবে।
তার মতে, ভিন্ন ধাপে ও দিনে ভিন্ন প্রশ্নপত্র ব্যবহার করে পরীক্ষা নিলে ঝুঁকি কমবে। কোনো কারণে পরীক্ষা ব্যাহত হলেও পুরো ব্যবস্থাটি আরও কার্যকরভাবে তা সামাল দিতে পারবে।
পাশাপাশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই পরীক্ষা বছরে একবার নেওয়া কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির জ্যেষ্ঠ ভিজিটিং ফেলো ইয়ামিনি আইয়ার বলছিলেন, ভারতের এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষা বছরে একাধিকবার দিতে পারবেন। কিছু পশ্চিমা দেশে এমন ব্যবস্থা রয়েছে।
ভাষ্য, ‘এতে কোনো পরীক্ষা বাতিল হয়ে গেলে বা ভালো করতে না পারলে শিক্ষার্থীরা আবার সুযোগ পাবেন। ফলে পুরো একটি বছর নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমবে।’
ভারতের লাখো শিক্ষার্থীর জন্য এই ঝুঁকি খুবই বাস্তব। অনেকে বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেন এবং প্রাইভেট কোচিংয়ে ব্যয় করেন হাজার হাজার রুপি। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা বাতিল বা স্থগিত হলে এই পরিশ্রম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে পারে।
মেডিকেলের প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর এমন পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন ১৭ বছর বয়সী পরি। পরীক্ষা বাতিলের পর ফের প্রস্তুতি নিতে হয়েছিল তাকে। তার কথায়, ‘এটা খুবই হতাশাজনক ছিল। ফের নতুন করে প্রস্তুতি নিতে হয়েছিল।’
ক্ষুব্ধ পরি বলছিলেন, ‘সরকার যত খুশি কমিটি গঠন করুন। কিন্তু আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা দরকার, যেটি প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে পারবে।’
শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের অনেকের দাবি, এনটিএ পুরোপুরি বাতিল করতে হবে। তবে শিক্ষাবিদরা বলছেন, সংস্থাটি বাতিল করলেই মূল সমস্যার সমাধান হবে না।
ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাবেক চেয়ারম্যান এম জগদেশ কুমারের কথায়, এনটিএ বিলুপ্ত করা সমাধান নয়। সংস্থাটির গভীর কাঠামোগত একটি সংস্কার প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেছেন, একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা থাকলে অভিন্ন নিরাপত্তা মান, প্রযুক্তি ও পরীক্ষার্থীদের সেবা এবং ফল প্রকাশের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা যায়। এ ছাড়া নতুন করে অনেকগুলো সংস্থা করা অনেক খরচসাপেক্ষ।
এ বিষয়ে একমত প্রকাশ করে বিজে রাও বললেন, ‘সবকিছুই খারাপ, এমন নয়। এনটিএ বেশ কয়েকটি পরীক্ষা সফলভাবে আয়োজন করেছে। সেসব পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর আমরা শুনিনি।’
তবে কিছু বিশেষজ্ঞের কাছে বিতর্কটি শুধু এনটিএকে ঘিরে নয়। তারা পুরো ব্যবস্থা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন। ইয়ামিনি আইয়ারের ভাষ্য, বড় প্রশ্নটি শুধু পরবর্তী প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো নয়। অল্প কয়েকটি সিটের বিপরীতে তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে কি না, সেটিও ভাবতে হবে।
কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, ভারতের এমন একটি পরীক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেটি একবারের উচ্চঝুঁকির পরীক্ষার ওপর কম নির্ভর করবে, শিক্ষার্থীদের একাধিকবার সুযোগ দেবে। কোনো কারণে পরীক্ষা ব্যাহত হলে তা আরও ভালোভাবে সামাল দিতে পারবে।
নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্স বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো দূর করতে সহায়তা করবে বলে আশাবাদী রাও। তবে অনেক শিক্ষার্থীর কাছে আরেকটি কমিটি গঠনের ঘোষণা আশার সঞ্চার করছে না।





