গাজার কণ্ঠস্বর কি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়?

সংগৃহীত ছবি
গাজায় যুদ্ধের খবর বিশ্বের কাছে পৌঁছানোর অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় হামলা, হতাহত এবং যুদ্ধের মধ্যে মানুষের জীবনযাপনের ছবি ও ভিডিও তুলে ধরছিল স্থানীয় সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষই। কিন্তু এসব পোস্ট সরাসরি মুছে না দিয়েও তাদের প্রচার কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে উঠেছে প্রশ্ন। ২০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এমন প্রশ্ন তুলেছে আল জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো পোস্ট অনলাইনে রেখেও সেটি কম মানুষের সামনে দেখানো, খুঁজে পাওয়া কঠিন করে দেওয়া বা কোনো অ্যাকাউন্টের দর্শক কমিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে কার্যত তার বিস্তার সীমিত করা সম্ভব। ফলে তথ্যটি অনলাইনে থাকলেও সেটি কত মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, তা হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক আহমেদ শিহাব এলদিন। ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারীর সংখ্যা ১১ লাখের বেশি। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ইসরায়েলি সেনাদের কথিত যুদ্ধাপরাধের ভিডিও এবং গাজার মানুষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা কিছু পোস্ট প্রকাশের পর তার পেজ একাধিকবার অদৃশ্য হয়ে যায়। কয়েকটি পোস্টের দর্শকও ব্যাপকভাবে কমে যায়। তার দাবি, তার কিছু পোস্ট দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে করা গণহত্যার মামলায় ব্যবহার করেছে।
পশ্চিম তীরে কর্মরত সাংবাদিক লেইলা ওয়ারাহ জানান, যুদ্ধের সময় তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট কয়েকবার বন্ধ হওয়ার পর আবার চালু হয়েছে। তার মতে, সমস্যা শুধু অ্যালগরিদমে সীমাবদ্ধ নয়। গাজার ছবি দেখে বিশ্বের কোনো মানুষ কিছু সময়ের জন্য বিচলিত হয়ে পরে নিজের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন। কিন্তু গাজার মানুষ সেই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান না।
লন্ডনভিত্তিক লেখক ও ডিজিটাল অধিকারকর্মী জিলিয়ান ইয়র্ক বলেন, ডিজিটাল সেন্সরশিপ সব সময় কোনো পোস্ট মুছে দেওয়ার মতো সরাসরি হয় না। পোস্ট অনলাইনে রেখেও তার প্রচার, খুঁজে পাওয়ার সুযোগ এবং দর্শক কমিয়ে দেওয়া সম্ভব।
এই অভিযোগের পেছনে আগের গবেষণার তথ্যও রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২৩ সালে ফিলিস্তিন-সংক্রান্ত ১ হাজার ৫০টি সেন্সরশিপের ঘটনা পরীক্ষা করে। এতে পোস্ট মুছে দেওয়া, অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা, মন্তব্য বা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ সীমিত করা এবং দর্শক কমে যাওয়ার মতো বিভিন্ন ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়। তবে সংস্থাটি জানিয়েছিল, এসব ঘটনা পুরো চিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে না।
২০২১ সালে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের পর মেটার নীতির একটি স্বাধীন পর্যালোচনাতেও ফিলিস্তিনি ও আরবি ভাষাভাষী ব্যবহারকারীদের মতপ্রকাশের অধিকারে নেতিবাচক প্রভাবের কথা উঠে আসে। তবে ফিলিস্তিনি কণ্ঠস্বর ইচ্ছাকৃতভাবে দমন করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে মেটা। আল জাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে সংস্থাটি জানায়, রাজনৈতিক মতের ভিত্তিতে নয়, তাদের নীতিমালা ভঙ্গের ভিত্তিতেই বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
তবে শিহাব-এলদিন বা ওয়ারাহর অ্যাকাউন্টের প্রচার ইচ্ছাকৃতভাবে কমানো হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সরাসরি কোনো জবাব দেয়নি মেটা। ডিজিটাল অধিকার সংগঠন অ্যাক্সেস নাউয়ের মারওয়া ফাতাফতা অবশ্য এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন প্রযুক্তিগত ভুল হিসেবে দেখছেন না। তার মতে, ফিলিস্তিনি কণ্ঠস্বর সীমিত হওয়ার ঘটনাগুলো আরও বিস্তৃত ও কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে।
ফলে গাজার তথ্যযুদ্ধ এখন শুধু সেখানে কী ঘটছে, তা বিশ্বের সামনে তুলে ধরার লড়াই নয়। সেই খবর কত মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং মানুষ সেটি আদৌ খুঁজে পাবে কি না, সেই প্রশ্নও ক্রমেই হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ।




