গাজায় রোবট বানাচ্ছে শিশুরা
- ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও থামেনি শেখার লড়াই
- তাঁবুর স্কুলের পাশেই সীমিত যন্ত্রে তৈরি হচ্ছে রোবট ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা

ছবি: রয়টার্স
কাঁধে নতুন ব্যাগ নেই, বসার বেঞ্চ নেই। এক দিকে ছেঁড়া তাঁবুর মেঝেতে হাঁটুর ওপর খাতা রেখে অঙ্ক কষছে শিশুরা, অন্য দিকে কয়েকটি তার, সেন্সর আর ছোট্ট প্রোগ্রামযোগ্য সার্কিট বোর্ড জুড়ে তৈরি হচ্ছে রোবটের আদল। প্রায় তিন বছরের যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির পর গাজায় শিক্ষার যে ছবি ফুটে উঠেছে, সেখানে ধ্বংসের পাশে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুই জেদ: পড়াশোনা ছাড়ব না, ভবিষ্যৎও ছাড়ব না। গত শনিবার ও রবিবার (১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত আল-জাজিরার দুটি পৃথক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই অবিচল লড়াইয়ের দুই মুখ।
গাজা নগরীর আল-কাতিবা এলাকায় গত শনিবার দুই ছেলের হাত ধরে অস্থায়ী স্কুলে যাওয়ার সময় ৩০ বছরের রানা তোতাহর মনে হয়েছিল, 'আজ যেন ঈদের দিন।' প্রায় ১০টি তাঁবু দিয়ে তৈরি সেই বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির শিশুরা গদিতে বসে পড়ে, খাতা রাখে হাঁটুর ওপর। নতুন শিক্ষাবর্ষে গাজায় প্রায় ৫ লাখ ৪১ হাজার শিক্ষার্থী আবার শিক্ষার আওতায় ফিরেছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
কিন্তু স্কুলে ফেরা মানেই স্কুলভবনে ফেরা নয়। জাতিসংঘের শিশু তহবিলের হিসাবে, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুলভবন ক্ষতিগ্রস্ত, আর ৯৩ শতাংশের বেশি ভবনে বড় ধরনের সংস্কার বা সম্পূর্ণ পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন। চার থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় সাত লাখ শিশু প্রায় তিন শিক্ষাবর্ষ নিয়মিত মুখোমুখি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
গাজা বন্দরের কাছে আহবাব শুজাইয়া বিদ্যালয়ে তিন শতাধিক শিশু এখনও মাটিতে বসে পড়ে। টেবিল-চেয়ার নেই। ছোটদের কেউ কেউ শক্ত কাগজকে লেখার পাটাতন বানায়। নিরাপত্তার কারণে ক্লাস চলে সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত। বিদ্যালয়ের পরিচালক ইনআম আল-বাত্রিখি বলেছেন, 'আজ মাটিতে বসে পড়তে পারছি। কিন্তু বৃষ্টি এলে আর পারব না।'
এই অভাবের ছবির মধ্যেই কয়েক কিলোমিটার দূরে অন্য এক শ্রেণিকক্ষ। মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহে ১৬ বছরের হামজা আল-আত্রাশ ও তার সহপাঠীরা হাতে গোনা বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ দিয়ে ছোট রোবট, আগুন ও গ্যাস শনাক্তকারী সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং নানা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের নমুনা তৈরির চেষ্টা করছে। তাদের স্বপ্ন, ভবিষ্যতে এমন রোবট বানানো, যা বিপজ্জনক জায়গায় মানুষের বদলে ঢুকতে পারবে, আগুন বা গ্যাস লিক শনাক্ত করবে, এমনকি ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষের খোঁজেও কাজে লাগবে।
কিন্তু কাজটা সহজ নয়। প্রয়োজনীয় সেন্সর, মোটর, সার্কিট বোর্ড, কম্পিউটার সবকিছুরই তীব্র অভাব। বিদ্যুৎও থাকে না নিয়মিত। অনেক সময় এক সেট যন্ত্র কয়েকজনকে ভাগ করে ব্যবহার করতে হয়। তবু হামজার কথায়, 'যন্ত্রপাতি নেই বলে আমরা থেমে যাব না। বরং যা আছে, তা দিয়েই সমাধান খুঁজতে শিখছি।'
যুদ্ধের আগে গাজায় প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ ও নতুন ব্যবসাকে সহায়তা করার একাধিক উদ্ভাবন কেন্দ্র ছিল। সেখানে তরুণেরা রোবটবিদ্যা, প্রোগ্রামিং, যন্ত্র নির্মাণ এবং নতুন ব্যবসার ধারণা নিয়ে কাজ করত। প্রশিক্ষক বাহা আল-মাসরির মতে, সেই কেন্দ্রগুলো তরুণদের কল্পনাকে বাস্তব নমুনা ও ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপ দেওয়ার সুযোগ দিত। যুদ্ধের পর প্রশিক্ষণকেন্দ্র, সরঞ্জাম ও যোগাযোগ অবকাঠামোর বড় অংশই নষ্ট হয়েছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক আহমদ আবু কামারের হিসাবে, গাজার তথ্যপ্রযুক্তি খাত এখন যুদ্ধপূর্ব সক্ষমতার ২৫ শতাংশেরও কম পর্যায়ে চলছে। ৭০ শতাংশের বেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বা আংশিকভাবে কাজ বন্ধ করেছে। কম্পিউটার, যোগাযোগযন্ত্র ও নেটওয়ার্ক সরঞ্জামের কিছু দাম বেড়েছে ৬০০ শতাংশেরও বেশি। কাজ হারিয়েছেন প্রায় ৩০ হাজার তথ্যপ্রযুক্তিকর্মী।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ আলতাহরাভির দাবি, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন প্রযুক্তিকর্মীদের ৮০ শতাংশেরও বেশি গাজা ছেড়েছেন। তার ভাষায়, 'গাজার ভবিষ্যৎ তার প্রযুক্তি খাত পুনর্গঠন ও বিকশিত করার ক্ষমতা থেকে আলাদা নয়।'
তারপরও শেখার আকাঙ্ক্ষা থামেনি। এক দিকে তাঁবুর নিচে অঙ্কের খাতা, অন্য দিকে ভাঙা শহরের মধ্যে তার-সেন্সর জুড়ে রোবট বানানোর চেষ্টা। ১১ বছরের ওসামা আলাইলেহর কথাটিই যেন পুরো গল্পের সারাংশ, 'গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা পড়াশোনা করি।'
গাজার শিশু-কিশোরদের কাছে তাই শিক্ষা এখন কেবল বইয়ের পাঠ নয়। কখনও তা তাঁবুর মেঝেতে লেখা অঙ্ক, কখনও ছোট্ট একটি রোবটের চাকা ঘোরানোর চেষ্টা, ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেও ভবিষ্যৎকে বাঁচিয়ে রাখার এক নীরব প্রতিরোধ।



