‘মেড ইন ইউরোপে’ ব্রিটেন নয়, কড়া অবস্থান ফ্রান্সের
- ইউরোপের করদাতাদের অর্থ ইউরোপের শ্রমিক ও কারখানায়, বললেন ফরাসি শিল্পমন্ত্রী
- জার্মানি ও নর্ডিক দেশগুলোর ভিন্নমত
- ব্রেক্সিটের পর নতুন বাণিজ্য-পরীক্ষায় লন্ডন

ছবি: রয়টার্স
একটি লেবেল, অথচ তার ভেতরে আবার আঁকা হচ্ছে ব্রেক্সিটের পুরনো সীমারেখা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন শিল্পনীতিতে কোন পণ্যকে “মেড ইন ইউরোপ” বলা হবে, সেই প্রশ্নেই এবার মুখোমুখি অবস্থানে ফ্রান্স ও ব্রিটেন। প্যারিসের কথা পরিষ্কার, ইইউর বাইরে থাকা যুক্তরাজ্যকে সদস্যদেশগুলোর সমান সুবিধা দেওয়া উচিত নয়।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) এএফপির প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ইইউ শিল্পমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে ফরাসি শিল্পমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ মার্ত্যাঁ বলেছেন, “ইউরোপীয় করদাতাদের অর্থ ইউরোপীয় শ্রমিক ও ইউরোপীয় কারখানাকেই সহায়তা করা উচিত।” ফ্রান্স চাইছে “মেড ইন ইউরোপ” নীতির সংজ্ঞা মূলত ইইউর ২৭ সদস্যের মধ্যেই সীমিত থাকুক।
প্রস্তাবটি ইইউর ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাকসেলারেটর অ্যাক্টের অংশ। এতে সরকারি ক্রয়, ভর্তুকি ও সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অন্যান্য কৌশলগত খাতে ইউরোপে তৈরি পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা রয়েছে। নীতিটির লক্ষ্য চীনের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকিপুষ্ট প্রতিযোগিতা ও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহে অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো। তবে আইনটি এখনও আলোচনাধীন।
যুক্তরাজ্যকে নিয়ে মার্ত্যাঁ বলেছেন, দেশটি কয়েক বছর আগে ইইউ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার ভাষায়, তাতে আলোচনা, বাণিজ্য বা নির্দিষ্ট খাতে চুক্তি বন্ধ হয় না, কিন্তু মৌলিক পার্থক্য হলো কেউ ইউরোপীয় প্রকল্পে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কেউ তা ছেড়েছে।
বৃহস্পতিবার লন্ডনে এক ব্রিফিংয়ে ফ্রান্সের ইউরোপমন্ত্রী বেঞ্জামিন হাদাদও প্রায় একই বার্তা দেন। তিনি বলেছেন, কেউ যদি অভ্যন্তরীণ বাজারের অংশ না হয় এবং তার আর্থিক সক্ষমতায় অবদান না রাখে, তবে সদস্যদের মতো একই ধরনের সুরক্ষা আশা করতে পারে না।
তবে ইইউর ভেতরেই এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। জার্মানি “মেড উইথ ইউরোপ” নামে বিস্তৃত কাঠামোর পক্ষে, যেখানে পারস্পরিক সুবিধার শর্তে যুক্তরাজ্যসহ ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। জার্মান অর্থনীতিমন্ত্রী ক্যাথারিনা রাইখে বলেছেন, একমুখী নির্ভরতা কমাতে হবে, কিন্তু ইউরোপকে বাকি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। নর্ডিক দেশগুলোরও এই অবস্থানের প্রতি সমর্থন রয়েছে।
সুইডেনের বিদায়ী উপপ্রধানমন্ত্রী এব্বা বুশ বলেছেন, তাদের দেশ এমন সমাধান চায় যাতে ইইউর বাইরের কিন্তু ইউরোপীয় বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোও পুরোপুরি বাদ না পড়ে। পোল্যান্ডের অর্থনৈতিক উন্নয়নমন্ত্রী মিখাল বারানোভস্কিও বলেছেন, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা শেষ পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, এখনই তা বলা খুব তাড়াতাড়ি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্য এখনও অনেকটাই খোলা রয়েছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লাইয়েনের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলেছেন। ব্রিটিশ গাড়িশিল্প বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন, কারণ যুক্তরাজ্য ও ইইউর গাড়ি সরবরাহব্যবস্থা গভীরভাবে যুক্ত এবং দুই পক্ষের বার্ষিক মোটরবাণিজ্যের মূল্য প্রায় ৮০ বিলিয়ন ইউরো।
আয়ারল্যান্ড, যা বর্তমানে ইইউর মন্ত্রীপর্যায়ের আলোচনায় সভাপতিত্ব করছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সমঝোতা চায়। ব্রিটিশ সরকার বলেছে, তারা “ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ইউরোপীয় অংশীদার” হিসেবে ইইউর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে। ফলে প্রশ্নটি এখন শুধু একটি উৎপত্তি-লেবেল নয়, বরং ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন ইউরোপের শিল্পনীতির ভেতরে কতটা জায়গা পাবে, তারও পরীক্ষা।



