ব্রেক্সিটের পর নতুন অধ্যায়
প্রতিরক্ষার স্বার্থে ইইউর সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে ব্রিটেন
- রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ছায়ায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে উদ্যোগ
- ‘ইউরোপের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের’ পথে লন্ডন

বদলে যাওয়া বিশ্ব রাজনীতিতে ইউরোপের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় ব্রিটেন
ব্রেক্সিটের পর যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, নিরাপত্তার প্রশ্নে এবার সেই ব্যবধান কমানোর পথে হাঁটছে ব্রিটেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কয়েক বছর পর আবারও ইইউর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা উদ্যোগে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে লন্ডন। লক্ষ্য, বদলে যাওয়া বিশ্ব রাজনীতিতে ইউরোপের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলা।
সোমবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি নিরাপত্তা মিশনে ফের যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার আগ্রাসন, ইউরোপের নিরাপত্তা সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ব্রিটেন ও ইইউ দুই পক্ষই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজন অনুভব করছে।
ব্রেক্সিটের পর ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ছাড়ে ব্রিটেন। সেই সময় অনেকের আশঙ্কা ছিল, বিচ্ছেদের ফলে শুধু বাণিজ্য নয়, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও দূরত্ব তৈরি হবে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। এখন রাশিয়ার সামরিক হুমকি, সাইবার হামলা এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা মোকাবিলায় লন্ডন ও ইইউ আবার সহযোগিতার পথ খুঁজছে।
ব্রিটিশ সরকারের এক সূত্রের বক্তব্য, ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় অংশ নেওয়ার বিষয়টি ব্রিটেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মহাদেশের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্রিটেন আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদে ফেরার পথে হাঁটছে।
লন্ডনের অবস্থান স্পষ্ট, ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা হবে, কিন্তু ব্রেক্সিটের সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নেওয়া হবে না। ব্রিটিশ সরকার এর আগে জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য ও সীমান্ত নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে ইউরোপের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা বাড়াতে চায়।
এই আলোচনার পেছনে রয়েছে আরও বড় ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের অনেক দেশ বুঝতে পারছে, শুধু জাতীয় প্রতিরক্ষা দিয়ে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। রাশিয়ার সামরিক চাপের পাশাপাশি ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ভূমিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপ নীতি নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
ব্রিটেন ইউরোপের অন্যতম বড় সামরিক শক্তি। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হিসেবে লন্ডনের ভূমিকা ইইউর নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। যদিও ব্রিটেন ইইউর সদস্য নয়, তবু প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় দেশটির অভিজ্ঞতা ও সামরিক সক্ষমতা ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে মূল্যবান।
তবে এই প্রত্যাবর্তনের পথ পুরোপুরি সহজ নয়। ব্রেক্সিটের পর সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ব্রিটেনে এখনও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর যে কোনও উদ্যোগকে দেশের অভ্যন্তরে সমালোচনার মুখেও পড়তে হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা সহযোগিতার এই উদ্যোগ আসলে ব্রেক্সিট-পরবর্তী বাস্তবতার স্বীকারোক্তি। অর্থনীতি, জলবায়ু, অভিবাসন কিংবা প্রতিরক্ষা–বড় সংকট মোকাবিলায় একা চলার সীমাবদ্ধতা এখন স্পষ্ট হচ্ছে।
তবে লন্ডনের জন্য এটি এক ধরনের ভারসাম্যের খেলা। একদিকে ব্রেক্সিটের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বজায় রাখা, অন্যদিকে ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকা–দুই পথ একসঙ্গে ধরে রাখতে চাইছে ব্রিটেন।
ব্রিটেন কি তবে ধীরে ধীরে ইউরোপের দিকে ফিরছে? উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার, ব্রেক্সিটের পর তৈরি হওয়া দূরত্বের মধ্যেও নিরাপত্তার বাস্তবতা লন্ডন ও ইইউকে আবার একই টেবিলে বসতে বাধ্য করছে।





