প্রযুক্তি দফতর ভেঙে নতুন ছক
এআই-যুগে ব্রিটেনের নতুন বাজি বার্নহ্যামের

ছবি: রয়টার্স
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে বড় ধরনের গুরুত্ব দেখালেও প্রযুক্তি প্রশাসনের কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটছেন যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। নতুন সরকারের পুনর্গঠন পরিকল্পনায় বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি বিষয়ক পৃথক মন্ত্রণালয় (ডিএসআইটি) বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এআই বিষয়ক মন্ত্রী পদকে আরও শক্তিশালী করে সরাসরি মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়া হয়েছে।
বার্নহ্যাম সরকারের এই সিদ্ধান্তে প্রযুক্তি খাতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। একদিকে এআইকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণে নিয়ে আসার বিষয়টিকে প্রযুক্তি খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে আলাদা প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেক প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা ও রাজনীতিক। তাঁদের আশঙ্কা, এমন সময়ে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বৈশ্বিক অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও উদ্ভাবনের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে, তখন প্রযুক্তি প্রশাসনের পৃথক কাঠামো দুর্বল করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
নতুন ব্যবস্থায় কানিষ্কা নারায়ণকে এআই বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁকে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে, যা ব্রিটিশ সরকারের এআই নীতির গুরুত্ব বাড়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে তিনি বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এআই ও অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
কানিষ্কা নারায়ণ বলেন, প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যামের মন্ত্রিসভায় এআইকে গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত এই খাতের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। এআই ব্যবহার করে সরকারি সেবা উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো তাঁর দায়িত্বের অন্যতম অংশ হবে।
তবে ডিএসআইটি বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের সরকার বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি খাতকে এক ছাতার নিচে আনতে এই মন্ত্রণালয় তৈরি করেছিল। এর দায়িত্ব ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, ডিজিটাল প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং প্রযুক্তি নীতি পরিচালনা করা। নতুন কাঠামোয় এসব দায়িত্ব বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে।
প্রযুক্তি খাতের সমালোচকদের আশঙ্কা, পৃথক প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় না থাকলে এআই, গবেষণা ও ডিজিটাল উদ্ভাবন জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় পিছিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য যখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এআই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার চেষ্টা করছে, তখন এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে বার্নহ্যাম সরকারের যুক্তি, প্রযুক্তিকে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে আটকে না রেখে ব্যবসা, শিল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রযুক্তি সংক্রান্ত কিছু দায়িত্ব ব্যবসা ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হতে পারে, যাতে এআই ও উদ্ভাবনকে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি ব্যবহার করা যায়।
বার্নহ্যামের এই পদক্ষেপ তাঁর বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ বলেও মনে করা হচ্ছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন, তাঁর সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্প পুনরুজ্জীবন এবং জনসেবার উন্নয়নে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে চায়। তবে প্রযুক্তি খাতের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় সরিয়ে এআইকে মন্ত্রিসভার পর্যায়ে উন্নীত করার এই নতুন মডেল কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন বড় পরীক্ষা।
ব্রিটেনের প্রযুক্তি নীতিতে এই পরিবর্তন এমন এক সময়ে এলো, যখন বিশ্বজুড়ে এআই নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক ব্যবহার নিয়ে নতুন প্রতিযোগিতা চলছে। বার্নহ্যাম সরকার এখন দেখাতে চাইছে, প্রশাসনিক কাঠামো বদলালেও প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা কমছে না।




