আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ডাউনিং স্ট্রিট, প্রথম দিনেই বাজিমাত বার্নহ্যামের
- স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নাশতা তৈরির কাজ দিয়ে দিন শুরু
- বাকিংহাম প্যালেসে রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাৎ
- ডাউনিং স্ট্রিটে গিয়ে জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণ
- কূটনীতিতেও সক্রিয়তা, মন্ত্রীসভার নিয়োগ

স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নাশতা তৈরির কাজ দিয়ে দিন শুরু করেন বার্নহ্যাম- রয়টার্স
যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের প্রথম দিনটি ছিল প্রতীকী বার্তা, সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ভরপুর। ভোরে মধ্য লন্ডনের একটি গৃহহীন মানুষদের আশ্রয়কেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নাশতা তৈরির কাজ দিয়ে দিন শুরু করেন তিনি। কয়েক ঘণ্টা পর বাকিংহাম প্যালেসে রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। এরপর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর '১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে' প্রথম ভাষণ দেন এবং একই দিন নতুন মন্ত্রিসভাও ঘোষণা করেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সোমবার দায়িত্ব নেওয়ার আগে মধ্য লন্ডনের গৃহহীনদের সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান দ্য প্যাসেজে যান বার্নহ্যাম। সেখানে স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে মাশরুম কাটা, নাশতা তৈরির প্রস্তুতি এবং গৃহহীন মানুষের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায় তাকে। ব্রিটিশ গণমাধ্যমের মতে, প্রথম দিনের এই কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তার সরকারের অগ্রাধিকার হবে সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষের জীবনমান উন্নয়ন।
আশ্রয়কেন্দ্রে বার্নহ্যাম তার মেয়র থাকার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বললেন, গ্রেটার ম্যানচেস্টারে মেয়র থাকাকালে ‘এ বেড এভরি নাইট’ কর্মসূচির আওতায় প্রতিদিন শত শত গৃহহীন মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে একটি শহরের একক উদ্যোগে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া গৃহহীনতা কমানো যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এরপর বাকিংহাম প্যালেসে গিয়ে রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বার্নহ্যাম। সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র দেওয়ার পর রাজা তাকে সরকার গঠনের আহ্বান জানান। সেই আহ্বান গ্রহণের মধ্য দিয়ে ব্রেক্সিট গণভোটের পর গত এক দশকে যুক্তরাজ্যের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন লেবার পার্টির এই নেতা।
প্যালেস থেকে সরাসরি ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে গিয়ে জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণ দেন বার্নহ্যাম। প্রচলিত রীতি ভেঙে তিনি কোনো প্রস্তুত লিখিত বক্তব্য বা বক্তৃতার মঞ্চ ছাড়াই কথা বলেন। ভাষণে তিনি স্বীকার করেন, রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে। তিনি বলেন, “আমরা যথেষ্ট ভালো করতে পারিনি। আমাদের আরও ভালো করতে হবে। আমরা সেটিই করব।”
নিজের সরকারকে তিনি ব্রিটেনের রাজনীতিতে একটি “সার্কিট ব্রেকার মুহূর্ত” হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, গত চার দশকে বেসরকারিকরণ ও শিল্প খাতের সংকোচনের যে ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে দেশকে নতুন পথে নেওয়ার সময় এসেছে। মানুষের সেবাকে সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রাখার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
প্রথম ভাষণেই কয়েকটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, নতুন আবাসন নির্মাণ, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনসেবার মান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া চলতি বছরের শেষ দিকে যুক্তরাজ্যের জন্য একটি ১০ বছরের জাতীয় পুনর্গঠন পরিকল্পনা প্রকাশের ঘোষণাও দেন তিনি।
দায়িত্ব নেওয়ার পরই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন বার্নহ্যাম। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎস এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন তিনি। ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাজ্যের সমর্থন অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে রাশিয়ার ওপর চাপ বজায় রাখার অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেন।
একই দিন জন হিলিকে অর্থমন্ত্রী, এড মিলিব্যান্ডকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ইভেট কুপারকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং ওয়েস স্ট্রিটিংকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন তিনি৷ শাবানা মাহমুদকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে বহাল রাখেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি স্টারমার সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর জায়গায় নতুন মুখ এনে নিজের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার অনুযায়ী মন্ত্রিসভা সাজিয়েছেন বার্নহ্যাম।
প্রথম দিনের প্রতিটি কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বার্নহ্যাম বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, তার সরকার কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, রাজনৈতিক অগ্রাধিকারেরও পরিবর্তন আনতে চায়। তবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গৃহহীনতা, জীবনযাত্রার ব্যয়, জনসেবা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলো তিনি কত দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারেন, এখন সেদিকেই নজর ব্রিটেনের রাজনৈতিক মহলের।




