‘রেড লাইন’ পেরিয়েছে ইসরায়েল, কঠোর হচ্ছে ব্রিটেন
- পশ্চিম তীরে নতুন বসতি নিয়ে লন্ডন-তেল আবিব সংঘাত
- ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন ও নির্মাণ ঠেকানোর ঘোষণা মিলিব্যান্ডের; নিষেধাজ্ঞা এলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি ইসরায়েলের

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড ও ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সা’র
দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কে এ বার কঠোর পথে হাঁটতে চলেছে ব্রিটেন। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নতুন অবৈধ বসতি সম্প্রসারণকে ‘রেড লাইন’ অতিক্রম বলে ঘোষণা করে দেশটির প্রতি ব্রিটিশ নীতি ‘ব্যাপকভাবে ঢেলে সাজানোর’ কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড। পাল্টা হুঁশিয়ারিও এসেছে তেল আবিব থেকে। ব্রিটেন নিষেধাজ্ঞা দিলে ইসরায়েলও ব্রিটেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সা’র।
মঙ্গলবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবার হাউস অব কমন্সে প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ইসরায়েল নীতিতে এই পরিবর্তনের ঘোষণা দেন মিলিব্যান্ড। তাঁর বক্তব্যের কিছুক্ষণের মধ্যেই ইসরায়েলের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার খবর জানায় বিবিসি।
বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিতর্কিত ‘ই-১’ বসতি প্রকল্প। পূর্ব জেরুজালেম ও ইসরায়েলি বসতি মা’আলে আদুমিমের মধ্যবর্তী এলাকায় প্রায় ৩ হাজার ৪০০ বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাড়ি নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে ইসরায়েল। সমালোচকদের আশঙ্কা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীর কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে একটি ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ও কার্যকর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই পরিকল্পনাকেই ‘রেড লাইন’ অতিক্রম বলে আখ্যা দিয়েছেন মিলিব্যান্ড। তাঁর বক্তব্য, ই-১ পশ্চিম তীরের কেন্দ্র দিয়ে চলে গেছে এবং একটি কার্যকর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান ধ্বংস হয়ে যাক, ব্রিটিশ সরকার তা মেনে নেবে না। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এ বিষয়ে একটি ‘সমন্বিত পদক্ষেপের প্যাকেজ’ ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
লন্ডনের পরিকল্পনার একটি বড় অংশ হতে পারে অবৈধ বসতির সঙ্গে ব্রিটিশ ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করা। মিলিব্যান্ড স্পষ্ট করেছেন, নতুন বসতিতে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান অর্থায়ন করুক, নির্মাণকাজে অংশ নিক কিংবা সেগুলোর বিজ্ঞাপন দিক–কোনোটিই চায় না তাঁর সরকার। কীভাবে এসব কার্যক্রম বন্ধ করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে। একই সঙ্গে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের সঙ্গে ব্রিটেনের বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্কও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
আরও এক ধাপ এগিয়ে অবৈধ বসতির সঙ্গে যুক্ত পণ্য ও সেবার বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার দাবিও উঠেছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী স্টিফেন ডাউটি জানিয়েছেন, সরকার আরও নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি অবৈধ বসতি থেকে আসা পণ্যের বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থাও বিবেচনা করছে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামও এর আগে এমন পদক্ষেপের কথা বলেছিলেন।
কিন্তু ব্রিটেনের এই অবস্থান ভালোভাবে নেয়নি ইসরায়েল। মঙ্গলবার হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সা’র বলেছেন, ব্রিটেন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে ইসরায়েলও ব্রিটেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কী ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, তা অবশ্য খোলসা করেননি তিনি। শুধু জানিয়েছেন, তাদের হাতে প্রয়োজনীয় ‘উপায়’ রয়েছে এবং সম্ভাব্য ব্রিটিশ পদক্ষেপের জবাব দেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
ই-১ পরিকল্পনার বিরোধিতা শুধু ব্রিটেনের নয়। ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালিসহ ২০টি দেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নও যৌথভাবে প্রকল্পটিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেছে। গত ১০ মার্চ বার্লিনে চেক প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই বাবিশের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস পরিকল্পনাটিকে ‘বড় ভুল’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। সাধারণত ইসরায়েলের শক্ত সমর্থক হিসেবে পরিচিত মের্ৎস সতর্ক করেছিলেন, এই উদ্যোগ দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে আরও কঠিন করে তুলবে।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরেই চাপ বাড়ছিল ব্রিটিশ সরকারের ওপর। এখন মিলিব্যান্ডের ঘোষণায় সেই চাপ সরাসরি নীতিগত পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে। তবে এখনও কোনো নতুন নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি; বিস্তারিত ব্যবস্থা আগামী কয়েক সপ্তাহে প্রকাশের কথা রয়েছে। ফলে লন্ডন কত দূর এগোয় এবং তেল আবিব সত্যিই পাল্টা কী ব্যবস্থা নেয়, সেদিকেই এখন নজর।





