ব্রেক্সিটে নতুন মোড়
বার্নহ্যামের হাতে ‘ইউরোপীয় কনফেডারেশন’-এর ছক
- অবাধ চলাচল বা ইউরো গ্রহণ নয়
- প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে ইউরোপের নিরাপত্তায় বড় ভূমিকার বিনিময়ে পণ্যের একক বাজারে ফেরার প্রস্তাব
- ব্রিটিশ সরকার বলছে, এখনও নিছক ‘নীতি-ভাবনা’

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
ব্রেক্সিটও থাকবে, আবার ইউরোপের একক বাজারের দরজাও খুলবে ব্রিটেনের জন্য–এমন পথ কি আদৌ সম্ভব? প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের হাতে পৌঁছানো নতুন এক প্রস্তাব ঘিরে সেই প্রশ্নই নতুন করে উঠেছে ব্রিটিশ রাজনীতিতে। ছকটি আরও নাটকীয় এই কারণে যে, ইউরোপের বাজারে বাড়তি প্রবেশাধিকারের বিনিময়ে ব্রিটেনকে শুধু বাণিজ্যিক ছাড় নয়, নিজের সামরিক শক্তি ও পরমাণু প্রতিরোধব্যবস্থার সুরক্ষাও ইউরোপের আরও বিস্তৃত অংশে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে বলা হয়েছে।
প্রস্তাবটির কারিগর সাবেক কনজারভেটিভ এমপি নিক বোলস। ২০১৯ সালে ব্রেক্সিট নিয়ে মতবিরোধের জেরে তিনি কনজারভেটিভ পার্টি ছেড়েছিলেন এবং পরে সদ্য প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে সরকার গঠনের প্রস্তুতিতেও সহায়তা করেন। তার পরিকল্পনাটি সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একাংশ দেখেছেন বলে খবর; তাদের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েলের নামও রয়েছে। তবে ডাউনিং স্ট্রিট বা বার্নহ্যাম সরকার প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছে এমন কোনো ঘোষণা নেই।
বোলসের মূল ভাবনা হলো, বর্তমান ইউরোপীয় রাজনৈতিক সম্প্রদায়কে আরও শক্তিশালী করে একটি চুক্তিভিত্তিক ‘ইউরোপীয় কনফেডারেশন’ তৈরি করা। সেটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ হবে না; বরং ইইউ ও ইইউ-বহির্ভূত ইউরোপীয় দেশগুলোর একটি বাইরের বলয় হিসেবে কাজ করবে। ব্রিটেনের পাশাপাশি ইউক্রেন, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড এবং পশ্চিম বলকানের দেশগুলোকেও এতে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
এই কনফেডারেশনের সদস্য হলে ব্রিটেন পণ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় একক বাজারে পূর্ণ অংশগ্রহণের সুযোগ পেতে পারে। এর জন্য ব্রেক্সিট বিতর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কয়েকটি বিষয়–মানুষের অবাধ চলাচল, শেনজেন ব্যবস্থায় যোগ দেওয়া কিংবা ইউরো মুদ্রা গ্রহণ মানতে হবে না, এমনটাই বোলসের প্রস্তাব। একই সঙ্গে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে যৌথ ক্ষেত্র এবং তরুণদের জন্য বিস্তৃত সুযোগ তৈরির কথাও তাঁর পরিকল্পনায় রয়েছে।
এটি অবশ্য পূর্ণাঙ্গ ইইউ সদস্যপদে ফিরে যাওয়া নয়। এমনকি বর্তমান ইউরোপীয় অর্থনৈতিক এলাকার প্রচলিত কাঠামোয় যোগ দেওয়ার প্রস্তাবও নয়। বরং বোলস এমন একটি নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে চাইছেন, যেখানে ব্রিটেন বাজারের সুবিধা পাবে এবং বিনিময়ে ইউরোপের নিরাপত্তায় অনেক বড় দায়িত্ব নেবে।
বাজারের দরজা খুলতে বিনিময়ও কম নয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্রিটেনকে প্রতিরক্ষা খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয়ের অঙ্গীকার করতে হবে। পাশাপাশি ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীর সুরক্ষা এবং স্বাধীন পরমাণু প্রতিরোধক্ষমতার ‘ছাতা’ ইউরোপজুড়ে বিস্তৃত করার প্রস্তাব রয়েছে, বিশেষ করে এমন মিত্রদের জন্য যারা বর্তমানে ন্যাটোর নিরাপত্তা নিশ্চয়তার আওতায় নেই।
বোলসের যুক্তির পেছনে বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান। তার মতে, ইউরোপ আর নিশ্চিতভাবে ধরে নিতে পারে না যে যুক্তরাষ্ট্র সব পরিস্থিতিতে মহাদেশটির নিরাপত্তায় আগের মতো একই মাত্রায় পাশে দাঁড়াবে। তাই বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষাকে আলাদা দুই সমস্যা হিসেবে না দেখে একই রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যে আনাই তাঁর কৌশল। ইউক্রেনকেও দ্রুত এই ব্যবস্থায় যুক্ত করে তার বিশাল সামরিক বাহিনী ও ড্রোন প্রযুক্তিকে ইউরোপীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
অর্থাৎ হিসাবটি মোটামুটি এমন, ব্রিটেন ইউরোপকে দেবে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার বাড়তি নিশ্চয়তা; ইউরোপ ব্রিটেনকে দেবে পণ্যের একক বাজারে ফেরার পথ।
কাগজে ছকটি যত আকর্ষণীয়, বাস্তবায়ন ততটাই কঠিন। সাবেক লেবার নেতা নিল কিনক পরিকল্পনাটিকে পারস্পরিক সুবিধার দিক থেকে বাস্তবসম্মত ভাবনা বললেও, এর সফল হওয়ার সম্ভাবনা এখন ‘খুবই দূরবর্তী’ বলে সতর্ক করেছেন। তার মূল আপত্তি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার একক বাজারের অখণ্ডতা নিয়ে অত্যন্ত কঠোর। ইউরোপীয় অর্থনৈতিক এলাকার বাইরে থাকা একটি দেশের জন্য এত ব্যাপক বাজারসুবিধা তৈরি করা নজিরবিহীন হবে। ব্রেক্সিটের অভিজ্ঞতায় ইইউর সঙ্গে ব্রিটেনের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই সমস্যাটিই কয়েক মাস আগে অন্য আলোচনাতেও দেখা গেছে। মে মাসে ব্রিটেন পণ্যের জন্য ইইউর সঙ্গে এক ধরনের একক বাজার তৈরির ভাবনা তুলেছিল বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়; ইউরোপীয় পক্ষ বরং শুল্ক ইউনিয়ন বা ইউরোপীয় অর্থনৈতিক এলাকার মতো পরিচিত কাঠামোর দিকে বেশি আগ্রহ দেখায়। ওই ধরনের ব্যবস্থায় ইইউর আইন ও অন্যান্য বাধ্যবাধকতার প্রশ্নও আসে, যা ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটিশ রাজনীতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
তবে এই প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা হচ্ছে, বার্নহ্যাম এই পরিকল্পনা গ্রহণ করেননি। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে গত মে মাসে তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, ব্রিটেনকে আবার ইইউতে নেওয়ার প্রস্তাব তিনি দিচ্ছেন না। ব্রেক্সিটকে তিনি দেশের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করলেও তার যুক্তি ছিল, ২০১৬ সালের গণভোটের লড়াই বারবার নতুন করে শুরু করলে দেশ রাজনৈতিক বিভাজনের এক স্থায়ী চক্রে আটকে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার অবস্থান কিছুটা বেশি খোলা হলেও এখনও একক বাজারে ফেরার ঘোষণা নেই। বার্নহ্যাম বলেছেন, স্টারমার আমলে ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে যে অগ্রগতি হয়েছে, সেটিকে তিনি সংহত করতে চান। ব্রিটিশ ইইউ আলোচকরাও কৃষি ও খাদ্যবাণিজ্য, কার্বন বাজারের সংযোগ এবং তরুণদের চলাচলসংক্রান্ত ব্যবস্থা নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর এই জোটের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান বিশ্বে ইউরোপের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতাকে ব্রিটেনের আলোচকরা ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেছেন।
আগের স্টারমার সরকারের ঘোষিত সীমারেখা ছিল, একক বাজারে নয়, শুল্ক ইউনিয়নেও নয়, মানুষের অবাধ চলাচলও নয়। বর্তমান পার্লামেন্টের মেয়াদে সরকার সেই সীমারেখা মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে ক্যাবিনেট অফিসের একটি সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে সূত্রটির বক্তব্য, সরকার নিয়মিত নানা ধরনের ‘অনুমাননির্ভর নীতি-প্রস্তাব’ পায়; সবকটি বাস্তবায়নের জন্য বিবেচিত হচ্ছে ধরে নেওয়া ভুল।
পরের নির্বাচনে কি বদলাবে সীমারেখা?
বিতর্কটি সেখানেই শেষ হচ্ছে না। দেশটির ইউরোপবিষয়ক মন্ত্রী হামিশ ফ্যালকনার সম্প্রতি বলেছেন, সরকার এখন ইইউতে ফেরার কথা বলছে না; কিন্তু লেবার পার্টির পরবর্তী নির্বাচনী ইশতেহারে কী থাকবে, সেটি এখনও ঠিক হয়নি। তাঁর বক্তব্য, ২০১৬ সালের তুলনায় বিশ্ব অনেক বদলে গেছে এবং ব্রিটেন-ইউরোপ সম্পর্ককেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের ইউরোপবিষয়ক মুখপাত্র আল পিঙ্কারটন তাই বার্নহ্যামের উপর চাপ বাড়িয়ে বলেছেন, ইউরোপ নিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে আরও উচ্চাভিলাষী অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। অন্যদিকে ইউরোপপন্থী সংগঠন বেস্ট ফর ব্রিটেন আরও এক ধাপ এগিয়ে বলছে, তাদের অর্থনৈতিক মডেল অনুযায়ী একক বাজারে ফিরলে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাজ্যের জিডিপি কমপক্ষে ৫৪ বিলিয়ন পাউন্ড বাড়তে পারে; তবে সংগঠনটি শেষ পর্যন্ত পূর্ণ ইইউ সদস্যপদকেই বেশি কার্যকর সমাধান মনে করে।
ফলে এই মুহূর্তে ব্রিটেনের সামনে নতুন কোনো সরকারি ব্রেক্সিট নীতি নেই। আছে একটি রাজনৈতিকভাবে সাহসী প্রস্তাব যেখানে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষাকে একই দরকষাকষির টেবিলে বসানো হয়েছে। দশ বছর আগে ব্রিটেনের প্রশ্ন ছিল, ইউরোপ থেকে বেরোবে কি না। এখন প্রশ্নটি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে, ইইউতে না ফিরেও ইউরোপের বাজার ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কতটা কাছে আবার যাওয়া সম্ভব?




