আফগান নারী ও ফিলিস্তিনিদের জন্য ব্রিটেনে খুলছে নতুন আশ্রয়ের পথ
- সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা শরণার্থীদের অগ্রাধিকার, শুরুতে শতাধিক মানুষকে নেওয়ার পরিকল্পনা
- ছোট নৌকার যাত্রা ঠেকাতে সংখ্যা যথেষ্ট নয়, সতর্কবার্তা বিশেষজ্ঞদের

আফগান নারী ও কিশোরী এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অগ্রাধিকার দিয়ে বন্ধ হয়ে থাকা একটি পুনর্বাসন কর্মসূচি আবার চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ
একদিকে ইংলিশ চ্যানেলের ঠান্ডা জল, অন্যদিকে যুদ্ধ আর নিপীড়ন থেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা। এই দুইয়ের মাঝখানে এবার একটি বৈধ দরজা খুলতে চাইছে ব্রিটেন। আফগান নারী ও কিশোরী এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অগ্রাধিকার দিয়ে বন্ধ হয়ে থাকা একটি পুনর্বাসন কর্মসূচি আবার চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের জন্য স্থায়ী বসবাসের পথও হবে তুলনামূলক দ্রুত।
লেবার পার্টির বার্ষিক সম্মেলন এ বছর লিভারপুলে ২৭ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলছে। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন, সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর, শাবানা মাহমুদ এই পুনর্বাসন কর্মসূচি আবার চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, দুই বছর কার্যত স্থগিত থাকা যুক্তরাজ্যের পুনর্বাসন কর্মসূচি তাঁর ঘোষণার পরই আবার চালু হবে।
রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ঝুঁকিতে থাকা নারী ও কিশোরী, আফগান এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ধারণা, মোট আগমনের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ হতে পারেন আফগান নারী ও কিশোরী এবং ফিলিস্তিনি।
শুরুতে সংখ্যা থাকবে কয়েক শ। অবৈধ অভিবাসন কমলে তা ধীরে ধীরে কয়েক হাজারে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতি বছর একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হবে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং ইন্টারন্যাশনাল রিফিউজি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্ট ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করবে। যুক্তরাজ্যে আসার আগে প্রত্যেকের নিরাপত্তা ও অপরাধসংক্রান্ত যাচাই হবে।
এই পথে আসা শরণার্থীরা অনির্দিষ্টকাল বসবাসের অনুমতি পাবেন এবং পাঁচ বছরের পথে স্থায়ী মর্যাদার দিকে এগোতে পারবেন। এর বিপরীতে ছোট নৌকাসহ অনিয়মিত পথে ব্রিটেনে পৌঁছানো শরণার্থীদের অবস্থান প্রতি ৩০ মাস অন্তর, সর্বোচ্চ ২০ বছর পর্যন্ত পর্যালোচনার আওতায় থাকতে পারে। তাঁদের দেশ নিরাপদ বলে বিবেচিত হলে ফেরত পাঠানোর সুযোগও থাকবে।
মাহমুদের বক্তব্য, কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং সবচেয়ে দুর্বল মানুষের জন্য বৈধ পথ পাশাপাশি চললেই অভিবাসন ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা ফিরবে। সোমবার লেবার সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ব্রিটিশরা এখনও যুদ্ধ ও নিপীড়ন থেকে পালানো মানুষের জীবন বাঁচানোর নীতিতে বিশ্বাস করেন, কিন্তু সেই ব্যবস্থা হতে হবে “সীমাবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত”। তাঁর মতে, ন্যায্যতার অনুভূতিই দেশের মানুষের “অন্তর্নিহিত উদারতা” উন্মুক্ত করতে পারে।
পরিবারের মূল সদস্যরা একসঙ্গে আসতে পারবেন, তবে সাম্প্রতিক পারিবারিক পুনর্মিলন বিধিনিষেধের কারণে বিস্তৃত আত্মীয়স্বজন এই সুযোগ পাবেন না। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পুরোনো আবেদনের প্রায় ৩০০ শরণার্থী আগের পুনর্বাসন ব্যবস্থায় যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন। নতুন আবেদন নেওয়া বন্ধ হয়েছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে।
এর পাশাপাশি অক্টোবর থেকে দাতব্য ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো শরণার্থীদের স্পনসর করার আবেদন করতে পারবে। কমিউনিটি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আশ্রয়, পুনর্বাসন এবং সমাজে মানিয়ে নিতে সহায়তা করবে। প্রথম দলটি আগামী বছরের শরৎ নাগাদ পৌঁছাতে পারে। ২০২৭ সালের বসন্তে প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে শরণার্থীদের কর্মসংস্থানভিত্তিক স্পনসরশিপের আবেদনও শুরু হওয়ার কথা।
তবে এই নীতি ইংলিশ চ্যানেলে ছোট নৌকার যাত্রা কতটা কমাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্রেশন অবজারভেটরির পরিচালক ম্যাডেলিন সাম্পশন বলেছেন, পুনর্বাসন বাড়ালেই অনিয়মিত আগমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, এমন কারণ নেই। রিফিউজি কাউন্সিলের জন ফিটনবির বক্তব্য, নিরাপদ বৈধ পথ পাচারকারীদের ব্যবসায় আঘাত করতে পারে, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন “শত নয়, হাজার হাজার” জায়গা।
নতুন পরিকল্পনার রাজনৈতিক সমীকরণ তাই দ্বিমুখী। একদিকে সীমান্তে কঠোরতা, অন্যদিকে যুদ্ধ ও নিপীড়ন থেকে পালানো সবচেয়ে অসহায় মানুষদের জন্য নিয়ন্ত্রিত দরজা। আর সোমবার লিভারপুলে লেবার সম্মেলনের মঞ্চে শাবানা মাহমুদের ঘোষণাই সেই নতুন নীতির আনুষ্ঠানিক সূচনা করবে।



