বার্নহ্যামই কি 'অবিভক্ত' যুক্তরাজ্যের শেষ প্রধানমন্ত্রী?
- কার্ডিফ থেকে ওয়েস্টমিনস্টারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ
- তিন সেল্টিক জাতির বার্তা: নিজেদের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে জনগণ

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
যুক্তরাজ্যের মানচিত্র কি একদিন ইতিহাসের পাতায় অন্য রকম হয়ে যাবে? কার্ডিফের উপসাগরের ধারে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) যে চার নেতা পাশাপাশি দাঁড়ালেন, তাদের বার্তা অন্তত সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে আনল। স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতাপন্থী নেতৃত্ব ঘোষণা করেছে, ওয়েস্টমিনস্টারের একচ্ছত্র সিদ্ধান্তের যুগ শেষের পথে। আর স্কটিশ ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনির আরও সরাসরি দাবি, অ্যান্ডি বার্নহ্যামই হতে পারেন গোটা যুক্তরাজ্যের শেষ প্রধানমন্ত্রী।
শনিবার কার্ডিফে এসএনপি নেতা জন সুইনি, প্লেইড কামরির রুন আপ আইওরওয়ার্থ এবং সিন ফেইনের মিশেল ও’নিল একটি সমঝোতাপত্রে সই করেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন সিন ফেইন প্রেসিডেন্ট ও আয়ারল্যান্ডের বিরোধী নেতা মেরি লু ম্যাকডোনাল্ড। দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, বৈঠকটি তাঁরা নিজ নিজ সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি হিসেবে নয়, দলীয় নেতা হিসেবে করেছেন। তবু এর রাজনৈতিক তাৎপর্য কম নয়, কারণ ইতিহাসে প্রথমবার স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে এমন নেতৃত্ব রয়েছে, যারা যুক্তরাজ্যের বাইরে আলাদা সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ চায়।
যৌথ ঘোষণার ভাষা ছিল কড়া। তাতে বলা হয়েছে, “ওয়েস্টমিনস্টারের সময় শেষের দিকে” এবং সাংবিধানিক পরিবর্তন আসছে। তিন পক্ষের দাবি, প্রতিটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আছে; কোনও ব্রিটিশ সরকার গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত আটকে দিতে পারে না। একই সঙ্গে লন্ডনকে সম্ভাব্য পরিবর্তনের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও সহায়তার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে তারা স্বীকার করেছে, তিন অঞ্চলের পথ এক নয়৷ স্কটল্যান্ড স্বাধীনতা চায়, উত্তর আয়ারল্যান্ডের লক্ষ্য একীভূত আয়ারল্যান্ড, আর ওয়েলসের নিজস্ব রাজনৈতিক গতিপথ রয়েছে।
সবচেয়ে তীক্ষ্ণ বার্তা এসেছে সুইনির কাছ থেকে। তার দাবি, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে স্কটল্যান্ডে নতুন স্বাধীনতা গণভোট হওয়া উচিত এবং সুযোগ পেলে স্কটরা এবার ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষেই ভোট দেবে। জনমত সমীক্ষার প্রবণতাকে নিজের বক্তব্যের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, স্কটল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে ওয়েস্টমিনস্টারের “বাধার” মুখে পড়েছে। ২০১৪ সালের গণভোটে অবশ্য ৫৫ শতাংশ ভোটার যুক্তরাজ্যে থাকার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু ব্রেক্সিটের পর বিতর্ক আবার জোরালো হয়, কারণ ২০১৬ সালে স্কটল্যান্ডের বড় সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের মিশেল ও’নিলও মুহূর্তটিকে ঐতিহাসিক বলে দেখছেন। শনিবার ডাবলিন সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি একীভূত আয়ারল্যান্ড দেখতে “ভালবাসবেন”। ও’নিলের মতে, ওই মন্তব্যই দেখায় বিতর্কটি এখন “খুবই জীবন্ত”; ব্রিটিশ সরকার আর পরিবর্তনের ঢেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। তাঁর ভাষায়, আসল পুরস্কার হলো দ্বীপের বিভাজনের অবসান এবং একটি নতুন আয়ারল্যান্ডের সূচনা।
ওয়েলসের রুন আপ আইওরওয়ার্থের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। প্লেইড কামরি স্বাধীনতাপন্থী হলেও তার সরকার এখনই গণভোটের তারিখ চাইছে না। বরং স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের মতো আরও ক্ষমতা, বিশেষ করে বিচার ও পুলিশিংয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ দাবি করেছে। একই দিনে ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডের সরকার আলাদা ‘কার্ডিফ অ্যাগ্রিমেন্ট’ সই করেছে, যেখানে শিশুদারিদ্র্য, জীবনযাত্রার ব্যয়, টেকসই প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক, ভাষা ও সংস্কৃতিতে সহযোগিতার কথা রয়েছে।
জনমতের ছবিও এই চাপকে একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছে না। গার্ডিয়ানের হিসাবে সাম্প্রতিক সমীক্ষায় স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন প্রায় ৪৭ শতাংশ, উত্তর আয়ারল্যান্ডে একীভূত আয়ারল্যান্ডের পক্ষে প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং ওয়েলসে স্বাধীনতার পক্ষে প্রায় ৩২ শতাংশ। সংখ্যাগুলো এখনও নিশ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়, কিন্তু তিন জায়গাতেই প্রশ্নটি মূলধারার রাজনীতিতে রয়েছে। উত্তর আয়ারল্যান্ডে আবার মিশেল ও’নিল এককভাবে সরকার চালান না; ডিইউপির ডেপুটি ফার্স্ট মিনিস্টার এমা লিটল-পেঙ্গেলির সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ করে ক্রস-পার্টি নির্বাহী পরিচালিত হয়। ফলে কার্ডিফের ঘোষণা গোটা নির্বাহীর নয়, স্বাধীনতাপন্থী রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থান হিসেবেই দেখা জরুরি। এই কারণেই চুক্তিটি প্রতীকী হলেও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ; এটি ভবিষ্যৎ গণভোটের দাবি সমন্বিত করার জন্য যৌথ চাপের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর '১০ ডাউনিং স্ট্রিট' অবশ্য পাল্টা জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম চার জাতির যুক্তরাজ্যে পরিবর্তন আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ইউনিয়নে দৃঢ় বিশ্বাসী। তার মুখপাত্র বলেছেন, সরকারের অগ্রাধিকার সাংবিধানিক বিতর্ক বা আরও গণভোট নয়; বরং পরিবারের ব্যয়চাপ কমানো ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়ানো। বিদ্রূপ হলো, এই মাত্র কয়েক দিন আগেই পার্লামেন্টে বার্নহ্যাম বলেছিলেন, স্কটল্যান্ডে জনমত স্পষ্টভাবে বদলালে গণভোটের প্রশ্ন বিবেচিত হতে পারে, যা স্বাধীনতাপন্থীরা সঙ্গে সঙ্গে লুফে নেয়।
তাই কার্ডিফের এই চুক্তি আজই যুক্তরাজ্য ভেঙে দিচ্ছে না। কিন্তু এটি তিন আলাদা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে প্রথমবার একটি দৃশ্যমান রাজনৈতিক ফ্রেমে এনে দিয়েছে। একদিকে লন্ডন বলেছে, এখন মানুষের অগ্রাধিকার অর্থনীতি; অন্যদিকে সেল্টিক নেতারা বলেছেন, অর্থনীতি ও গণতন্ত্র দুটিই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা কোথায় থাকবে, সেই প্রশ্নে গিয়ে মেশে। ভবিষ্যৎ গণভোট কখন হবে, হবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু ব্রিটেনের সাংবিধানিক প্রশ্ন আর চাপা নেই; কার্ডিফে তা প্রকাশ্য মঞ্চে উঠে এসেছে।



