বিশ্ববিদ্যালয়ই একমাত্র পথ নয়
১৪ বছর থেকেই কর্মমুখী শিক্ষায় জোর বার্নহ্যামের

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সেই ধারণা, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিকেই সাফল্যের প্রধান পথ হিসেবে দেখা হতো, সেখান থেকে সরে এসে এবার ১৪ বছর বয়স থেকেই শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার নতুন পথ খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে তাঁর সরকার। বার্নহ্যামের কথায়, "আজ থেকে ব্রিটেনে গ্র্যাজুয়েশন ক্যাপের মতোই হার্ড হ্যাটকেও সমান মূল্য দেওয়া হবে।"
মঙ্গলবার ইংল্যান্ডের ডার্বিতে একটি রেল উৎপাদন কারখানা পরিদর্শনের সময় নতুন এই শিক্ষানীতির ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিনে সরকার শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের বিস্তারিত রূপরেখাও প্রকাশ করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ইংল্যান্ডের শিক্ষার্থীরা ১৪ বছর বয়স থেকেই ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মূল বিষয়গুলোর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), প্রকৌশল, উৎপাদনশিল্প, নির্মাণ, ডিজিটাল প্রযুক্তিসহ স্থানীয় শিল্প ও কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন কারিগরি বিষয় পড়ার সুযোগ পাবে। পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে থাকবে কর্মক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রকল্প এবং শিক্ষানবিশ কর্মসূচিও।
বার্নহ্যাম বলেন, বহু বছর ধরে তরুণদের এমন ধারণা দেওয়া হয়েছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিই জীবনে সফল হওয়ার একমাত্র পথ। কিন্তু বাস্তবে নির্মাণ, প্রকৌশল, উৎপাদন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি ক্রমশ বাড়ছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার সময় এসেছে। তাঁর বার্তা, "নির্মাণ, কোডিং কিংবা ক্লাসিকস, গণিত, উৎপাদন বা মেকানিক্স, যে পথই বেছে নাও না কেন, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ এবং সমান সম্মান তোমরা পাবে।"
নতুন পরিকল্পনার আওতায় ইংল্যান্ডের মেয়র, স্থানীয় প্রশাসন, স্কুল, কলেজ এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান যৌথভাবে প্রতিটি অঞ্চলের কর্মসংস্থানের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি শিক্ষার রূপরেখা তৈরি করবে। এই মডেলের ভিত্তি গ্রেটার ম্যানচেস্টারে মেয়র থাকাকালীন বার্নহ্যামের চালু করা গ্রেটার ম্যানচেস্টার ব্যাকালরিয়েট (এমবিএসিসি), যেখানে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা, টি-লেভেল, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। সরকার এবার সেই মডেলকে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ করতে চায়।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী ১০ লক্ষেরও বেশি তরুণ শিক্ষা, চাকরি কিংবা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে শ্রমবাজারে যে পরিবর্তন আসছে, সেই বাস্তবতায় তরুণদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করাই এই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছে সরকার। পাশাপাশি দেশজুড়ে প্রায় ১৮০টি 'ইয়ুথ হাব' গড়ে তোলা হবে, যেখানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তা একই ছাতার নিচে পাওয়া যাবে।
তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকদের একাংশের আশঙ্কা, কারিগরি শিক্ষায় অতিরিক্ত জোর দেওয়ার ফলে শিল্পকলা ও মানবিক বিষয়ে আগ্রহ কমে যেতে পারে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও প্রভাবিত হতে পারে। যদিও বার্নহ্যামের দাবি, এটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার বিকল্প নয়, বরং তরুণদের সামনে আরও বেশি সুযোগ সৃষ্টি করার উদ্যোগ। তাঁর ভাষায়, "তরুণদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাব নেই, সুযোগের অভাব রয়েছে। আমাদের দায়িত্ব সেই সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।"




