জরুরি অবতরণ, যুদ্ধবিমানের পাহারা
ইউরোপের আকাশে বোমাতঙ্ক
- লন্ডনের হিথ্রো থেকে বার্মিংহাম, রোম থেকে সোফিয়া, একের পর এক উড়োজাহাজে বোমা থাকার বার্তা
- আতঙ্কের নেপথ্যে কারা?

ছবি: রয়টার্স
আকাশে উড়ছে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ। ভেতরে শত শত মানুষ। কেউ বাড়ি ফিরছেন। কেউ যাচ্ছেন কর্মস্থলে। হঠাৎ খবর, বিমানে বোমা! বদলে যাচ্ছে গতিপথ। কোথাও জরুরি অবতরণ। কোথাও যাত্রীবাহী বিমানের পাশে ছুটছে সামরিক যুদ্ধবিমান। বৃহস্পতিবার ইউরোপের আকাশজুড়ে এমনই আতঙ্কের ছবি। কিন্তু বিস্ফোরক কোথায়? তল্লাশিতে মিলছে না কিছুই। তবু একের পর এক হুমকি। প্রশ্ন উঠছে, বোমা ছাড়াই কি ইউরোপের আকাশে শুরু হয়েছে নতুন ধরনের ছায়াযুদ্ধ?
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এদিন অন্তত ২৫টি উড়োজাহাজের যাত্রা ব্যাহত হয়েছে। সপ্তাহজুড়ে সংখ্যাটি ৩০ ছাড়িয়েছে। ব্রিটেন, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, বুলগেরিয়া, ফ্রান্সসহ অন্তত ১৬টি দেশের আকাশপথে ছড়িয়েছে সতর্কতা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রায়ানএয়ার, এয়ার লিঙ্গাস, উইজ এয়ার, ফিনএয়ারসহ দশটি বিমান সংস্থার পরিষেবা।
ব্রিটেনের হিথ্রো ও বার্মিংহাম বিমানবন্দরেও পৌঁছেছে বোমা হামলার হুমকি। বৃহস্পতিবার দ্য টাইমস জানিয়েছে, ইউরোপজুড়ে বিমান ঘুরিয়ে নেওয়ার মধ্যেই দুটি বিমানবন্দরকে নিশানা করা হয়। লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, হিথ্রো থেকে যাওয়া কিংবা সেখানে আসা চারটি উড়োজাহাজ সম্পর্কে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তদন্তে নিরাপত্তাঝুঁকির প্রমাণ মেলেনি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ফ্রান্সে। ডাবলিন থেকে রোমগামী এয়ার লিঙ্গাসের উড়োজাহাজ ঘুরিয়ে নামানো হয় প্যারিসের পশ্চিমে এভরু সামরিক বিমানঘাঁটিতে। নিরাপদে নামেন ১৫১ যাত্রী ও ছয় কর্মী। বুলগেরিয়ায় মাদ্রিদ ও কোপেনহেগেন থেকে আসা দুটি রায়ানএয়ার উড়োজাহাজ জরুরি অবতরণ করে। লন্ডন থেকে সোফিয়াগামী আরেকটি বিমান নামে প্লভদিভে। কয়েকটি বিমানকে পাহারা দেয় যুদ্ধবিমান। মিলান থেকে ওয়ারশগামী একটি উড়োজাহাজ ঘুরিয়ে নেওয়া হয় ভিয়েনায়।
ঘটনার সূত্রপাত সোমবার। লন্ডন থেকে বুলগেরিয়াগামী একটি বিমান হুমকির জেরে বুদাপেস্টে নামে। মঙ্গলবারও সাতটি উড়োজাহাজে তল্লাশি অথবা গতিপথ পরিবর্তন করতে হয়। সব ক্ষেত্রেই হুমকি ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে।
তাহলে কারা ছড়াচ্ছে আতঙ্ক? রোম ও সোফিয়ার বিমানবন্দরে পাঠানো বার্তায় নিজেদের ‘মেল স্টেটের যোদ্ধা’ দাবি করা হয়েছে। রাশিয়ার উগ্র জাতীয়তাবাদী ও নারীবিদ্বেষী একটি সংগঠনের নাম এটি। তবে সংগঠনটির সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি। রাশিয়া কিংবা ইরানের কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতাও নিশ্চিত করেননি তদন্তকারীরা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবহন কমিশনার আপোস্তোলোস জিজিকোস্তাস বলেছেন, ঘটনাগুলো পরস্পর সম্পর্কিত কি না, সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনও আসেনি। ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো একে ‘সীমার নিচে পরিচালিত যুদ্ধকৌশল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, এমনভাবে অস্থিরতা তৈরি করা হয়, যাতে দায়ী ব্যক্তিকে শনাক্ত করা কঠিন হয়।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বারবার মিথ্যা সতর্কতা নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াতে পারে। তবে বৃহস্পতিবার সব উড়োজাহাজ নিরাপদে অবতরণ করেছে। কোথাও বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি।
ইউরোপের আকাশে তাই আপাতত বোমার চেয়ে বড় আতঙ্ক অদৃশ্য হুমকি। যুদ্ধবিমান আছে। নিরাপত্তারক্ষী আছে। অথচ প্রতিপক্ষের পরিচয়ই অজানা। যে আকাশে মানুষ নিশ্চিন্তে যাত্রা করতে চায়, সেখানে এখন ভয় ছড়ানোই হয়ে উঠছে নতুন অস্ত্র৷



