ইরানের সঙ্গে ‘শেষ’ যুদ্ধবিরতি চুক্তি
- আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের ট্রাম্প

ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি (এমওইউ) ‘শেষ’ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, “তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করা ‘সময়ের অপচয়’। আমি তাদের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না, ওরা নিকৃষ্ট।” গতকাল বুধবার তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বললেন তিনি। হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী জাহাজের ওপর ‘তেহরানের’ হামলার পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি হামলার ধারাবাহিকতায় এমন কথা বললেন ট্রাম্প। পাশাপাশি তিনি এদিন অর্থমন্ত্রীকে স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধের নির্দেশ দেন। এদিকে নিজেদের নিরাপত্তা জোরদারে ন্যাটো সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলো ৫০ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘যুদ্ধবিরতি’ নিয়ে ট্রাম্প বললেন, ‘আমার মনে হয় এটি শেষ হয়ে গেছে।’ তিনি আরও বললেন, ‘আমি ওদের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না, ওরা নিকৃষ্ট। যতদূর আমার মনে হয়, এটি শেষ হয়ে গেছে। তাদের সঙ্গে কথা বলা শুধু সময় নষ্ট করা, তারা মিথ্যাবাদী।’ তিনি জানান, উভয়পক্ষের আলোচকরা ‘কথা বলতে পারেন’, কিন্তু তা শুধু ‘তাদের সময়ের অপচয়’। ট্রাম্প আরও যোগ করেন, ‘সত্যি বলতে, আমি তাদের সঙ্গে আমার সময় নষ্ট করতে চাই না। আমাদের চমৎকার আলোচকরা চাইলে কথা বলতে থাকুন, কিন্তু আমি তেমনটি দেখছি না।’
ট্রাম্প ইরানিদের ‘অসুস্থ লোকজন’, দেশটির শাসকদের ‘দুষ্টলোক’ ও ইরানি প্রশাসনকে ‘পাগল’ বলে অভিহিত করেন। তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না বলে ওয়াশিংটনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিন তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করা ‘সময়ের অপচয়’ বলে মন্তব্য করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ইরান যুদ্ধে সহায়তা না করায় তিনি ন্যাটোর প্রতি অসন্তুষ্টি জানানোর পাশাপাশি স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধে অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন
গত মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালিতে কয়েকটি জাহাজের পাশাপাশি গতকাল কুয়েত ও বাহরাইনে ইরানের হামলা নিয়েও তীব্র উষ্মা প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তার ভাষ্য, ‘তারা দুষ্ট-অসুস্থ লোক। তারা ক্যানসার, আর আপনারা জানেন কী করতে হবে— ক্যানসারকে প্রথমেই কেটে ফেলতে হবে।’
ট্রাম্প আরও বলেছেন, ‘আমরা গত রাতে (মঙ্গলবার রাত) তাদের ওপর কঠিন আঘাত হেনেছি। আমি তাদের বলেছি, প্রত্যেকবার তোমরা আঘাত করবে, আমরাও আঘাত করব। আর অবশ্যই তারা নোংরা খেলোয়াড়। তাই তারা প্রত্যেকের পেছনে লাগতে পারে, সম্ভবত আমিসহ।’
ট্রাম্প বললেন, ‘আমি ন্যাটোকে নিয়েও সন্তুষ্ট না। কারণ তারা এক নম্বরের রাষ্ট্র-সমর্থিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করেনি। ওই রাষ্ট্রটি হলো ইরান।’
স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধের নির্দেশ ট্রাম্পের: ট্রাম্প গতকাল আঙ্কারায় ন্যাটো সদস্য দেশ স্পেনের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এদিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টকে এই নির্দেশ দেন তিনি। প্রতিরক্ষা ব্যয় না বাড়ানো এবং ইরান যুদ্ধে সাহায্য না করায় মাদ্রিদের বিরুদ্ধে এমন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। একই সঙ্গে ট্রাম্প আবারও বললেন, গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা উচিত। এতে ন্যাটোর আরেক সদস্য ডেনমার্ক অসন্তোষ প্রকাশ করে জানায়, তারা নিজেদের ভূখণ্ডের ‘প্রতিটি ইঞ্চি’ রক্ষা করবে।
এদিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘স্বাভাবিক ঘটনা’ হিসেবেই দেখছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিদ্যমান ‘চমৎকার’ সম্পর্ক পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই।
ন্যাটো সম্মেলনে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর: আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো গত মঙ্গলবার ৫০ বিলিয়ন কোটি ডলার মূল্যের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করছে। প্রতিরক্ষা শিল্প ফোরামে বক্তব্যে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে জানান, জোটের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে মিত্র দেশগুলো নতুন বড় প্রকল্প ঘোষণা করছে। বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল। তার মতে, এসব বিনিয়োগ নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি অর্থনীতি শক্তিশালী এবং লাখো নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
ন্যাটো জানিয়েছে, তারা নর্থরপ গ্রুম্যান থেকে পাঁচটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন দীর্ঘ পাল্লার ড্রোন কিনবে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে ড্রোন প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়াতে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর জন্য বর্তমানে যত ড্রোন অপারেটর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তার পাঁচ গুণ বেশি প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জোটটি আরও জানিয়েছে, তাদের পুরনো ই-৩ নজরদারি বিমানগুলো ধীরে ধীরে সুইডিশ প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান সাবের তৈরি সর্বোচ্চ ১০টি গ্লোবালআই নজরদারি বিমান দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হবে। এই প্রকল্পে অংশ নেবে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাও। এদিকে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন এই কর্মসূচিকে সুইডেনের জন্য অত্যন্ত গর্বের মুহূর্ত বলে মন্তব্য করেছেন।
নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প ন্যাটো মিত্রদের: ইউক্রেনে ও রাশিয়ার পাল্টাপাল্টি মিসাইল হামলা চলছেই। এর মধ্যেই ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে ১২টি ন্যাটো দেশ একটি অত্যাধুনিক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করতে পরবর্তী ১০ বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ‘ডিপ প্রিসিশন স্ট্রাইক’ নামক এই আঙ্কারায় চলমান ন্যাটো সম্মেলনে গতকাল আলোচনার জন্য উপস্থাপন করার কথা রয়েছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার মঙ্গলবার এই সম্মেলনে অংশ নিয়ে মিত্রদের সুরক্ষায় নিজের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি জানিয়েছেন, ন্যাটোকে আগামী বছরগুলোয় নিরাপদ রাখতে ও ইউরোপীয় মিত্রদের ঐক্যবদ্ধ করতে সহায়তা করবে এই ব্রিটিশ উদ্যোগ।
এই ক্ষেপণাস্ত্র ২০০ মাইল থেকে ১ হাজার ২৫০ মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও ২০৩০ সালের আগে প্রস্তুত হবে না এটি।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেছেন, ‘আঙ্কারা থেকে আমরা পুতিনকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছি— ন্যাটো এখন শক্তিশালী। ইউরোপীয় এবং আমাদের নাগরিকদের পুতিন ও রুশ রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি হুমকি থেকে রক্ষা করতে প্রস্তুত।’ তিনি আরও জানান, এই সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনে যেকোনো আগ্রাসনকে প্রতিহত করবে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রুশ হামলা মোকাবিলায় দ্রুত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছেন। বিপরীতে, ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ন্যাটোর এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে একে সংঘাতমূলক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ন্যাটোর কোনো অস্ত্রই সামরিক লক্ষ্য অর্জন থেকে বিরত রাখতে পারবে না রাশিয়াকে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউজের মসনদে বসার পর থেকে ন্যাটো সদস্যদের প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াতে চাপ দিচ্ছেন। সূত্র: বিবিসি




