কানাডার অ্যান কারসন পেলেন সাহিত্যের নোবেল

অ্যান কারসন। ছবি: নোবেল কমিটি
২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডীয় লেখক অ্যান কারসন। ‘শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে খেলাচ্ছলে সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যের জন্য নতুন নতুন রূপ সৃষ্টি করা তার সাহসী ও সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের জন্য’ তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নোবেল কমিটি।
পুরো সাহিত্যজীবনেই অ্যান কারসন কবিতা লেখার পাশাপাশি অনুবাদের কাজ করেছেন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন।
অ্যান কারসনের জন্ম ১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টো শহরে। ১৯৮১ সালে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে করা পিএইচডির গবেষণাপত্র ‘ওদি এৎ আমো এরগো সুম’ প্রকাশ করেন তিনি।
নোবেল কমিটির মতে, কারসনের প্রায় সব লেখাতেই ভাষাতত্ত্ববিদের মতো শব্দের গভীরে যাওয়ার চেষ্টা এবং কবির মতো নতুন অর্থ খোঁজার আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে কাজ করেছে। কারসন নিজেও বলেছেন, শব্দের উৎপত্তি বা ব্যুৎপত্তি থেকেই তার কাজের শুরু।
নোবেল কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাচীন গ্রিক থেকে কারসনের করা অনুবাদগুলোও আলাদা সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে স্যাফোর কবিতার খণ্ডাংশের অনুবাদ ‘ইফ নট, উইন্টার’ (২০০২)। তিনি সফোক্লিসের ‘ইলেক্ট্রা’ (২০০১) ও ‘অ্যান্টিগনি’ (২০১৫) এবং ইউরিপিদিসের ‘ব্যাক্কাই’ (২০১৫)-এর মতো গ্রিক ট্র্যাজেডিও অনুবাদ করেছেন।
কারসনের দীর্ঘ প্রবন্ধ ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ (১৯৮৬) তার পরবর্তী কাজের ভিত্তি তৈরি করে। এতে ইরোসকে কবিতার মূল শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। স্যাফোর ব্যবহৃত একটি যৌগিক বিশেষণের ওপর ভিত্তি করে কারসন দেখিয়েছেন, প্রেম একই সঙ্গে বেদনা ও মাধুর্যের অনুভূতি তৈরি করে। প্রেমিক ও প্রিয় মানুষের মধ্যকার দূরত্বই এই অনুভূতিকে শক্তি দেয় এবং কবিতাকে এগিয়ে নেয়।
কারসনের লেখায় বিভিন্ন কণ্ঠকে পাশাপাশি হাজির করার প্রবণতা দেখা যায়। ‘ইকোনমি অব দ্য আনলস্ট’ (১৯৯৯) প্রবন্ধে তিনি খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের গ্রিক কবি সিমোনিদেস অব কেওসের সঙ্গে পল সেলানকে পাশাপাশি এনেছেন। ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’ (২০০০) বইয়ে ইতিহাসবিদ থুসিডিদেসকে মিলিয়েছেন ভার্জিনিয়া উলফের সঙ্গে।
এ ধরনের অপ্রত্যাশিত সাহিত্যিক সমন্বয়ের মাধ্যমে কারসন প্রচলিত আত্মকেন্দ্রিক গীতিকবিতার গণ্ডি পেরিয়ে নতুন ধরনের লেখার পথ তৈরি করেছেন। তার লেখায় ধ্রুপদি ও আধুনিক কবিতা যেমন একসঙ্গে এসেছে, তেমনি বিভিন্ন সাহিত্যধারা ও শিল্পমাধ্যমও মিশে গেছে।
১৯৯০-এর দশকে তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘দ্য গ্লাস এসে’। এটি ‘গ্লাস, আইরনি অ্যান্ড গড’ (১৯৯৫) বইয়ের অংশ। এখানে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধের সীমারেখা প্রায় মিশে গেছে।
‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড : আ নভেল ইন ভার্স’ (১৯৯৮)-এ কারসন প্রাচীন গ্রিক পুরাণকে আধুনিক গল্পে রূপ দিয়েছেন। স্টেসিকোরাসের কবিতার জেরিয়ন চরিত্রকে তিনি এক সংবেদনশীল তরুণ হিসেবে তুলে ধরেছেন, যে হেরাক্লিসের প্রেমে পড়ে।
২০০১ সালের ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’-এ প্রতারণায় ভরা এক দাম্পত্য সম্পর্ককে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বইটির প্রতিটি অংশের শুরুতে রয়েছে জন কিটসের কবিতার পঙ্ক্তি।
ভাই মাইকেলের স্মৃতিতে কারসন লেখেন ‘নক্স’ (২০১০)। ছবি, চিঠি ও লেখার সমন্বয়ে তৈরি এই বইটি একটি ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম। এতে রোমান কবি ক্যাটুলাসের ভাইকে নিয়ে লেখা শোককবিতার অনুবাদও রয়েছে।
এরপর ‘ফ্লোট’ (২০১৬) বইয়ে ২২টি ছোট বই একসঙ্গে করা হয়। আর ‘রং নরমা’ (২০২৪)-তে কারসন সাহিত্য, শিল্প ও একাডেমিয়ার বিভিন্ন ক্ষেত্রকে একত্র করেছেন।
চিত্রশিল্পী, কোরিওগ্রাফার এবং অপেরা ও থিয়েটার পরিচালকদের সঙ্গে তার যৌথ কাজও তার স্বাধীন সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দেয়। প্রচলিত সাহিত্যিক নিয়ম ভেঙে বিভিন্ন মাধ্যম ও ধারার মধ্যে অবাধে চলাচলের এই বৈশিষ্ট্যই আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও শিল্পাঙ্গনে কারসনের গুরুত্ব বাড়িয়েছে।




