জৌলুশ ছেড়ে গ্রামের স্কুলে নায়লা

শ্রেণিকক্ষে শিশুদের পড়াচ্ছেন নায়লা সারাফ
সাফল্য মানেই কি মোটা অঙ্কের বেতন, দামি গাড়ি আর উঁচু পদের তকমা? অর্থের লোভ, ক্ষমতার মোহ কিংবা করপোরেট জীবনের চাকচিক্য— এসবের পেছনে ছুটে চলাই যখন বর্তমান সমাজ ও ক্যারিয়ারের প্রচলিত নিয়ম, তখন ঠিক তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নায়লা সারাফ। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতকোত্তর পাস করা একজন প্রকৌশলী হয়েও তিনি বেছে নিয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের পড়ানোর কাজ।
নেত্রকোনা সদর উপজেলার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা পেশায় পুরোপুরি মজেছেন তিনি।
ঢাকার মোহাম্মদপুরের এক সম্ভ্রান্ত উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা নায়লা সারাফের। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে সফলতার সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পার হন। এরপর দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষ করার পর ক্যারিয়ারে সুযোগ-সুবিধার কোনো অভাব ছিল না তার। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কাজের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। তবে সেখানকার দাপ্তরিক পরিবেশের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক মিল না পাওয়ায় চাকরি ছেড়ে দেন। পরে জনতা ব্যাংকে এক্সিকিউটিভ অফিসার পদেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
ক্যারিয়ারের একের পর এক বড় বড় সুযোগ তিনি মাড়িয়ে গেছেন কোনো আক্ষেপ ছাড়াই। বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও ভাইভায় অংশ নেওয়ার তাগিদ অনুভব করেননি। এমনকি বিদেশ থেকেও তার কাছে একাধিক আকর্ষণীয় চাকরির প্রস্তাব এসেছিল, যা সহজেই যেকোনো তরুণ বা তরুণীর জীবন বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
কিন্তু প্রচলিত পদমর্যাদা, বিশাল বেতন আর ক্ষমতার চেয়ে নায়লার কাছে নিজের আত্মতৃপ্তি ও মানসিক শান্তিটাই ছিল মুখ্য। নিজের জীবনদর্শন ও সিদ্ধান্ত নিয়ে নায়লা সারাফ আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, একটি উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে ছোটবেলা থেকেই পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আমি বড় হয়েছি। তাই জীবনে কোনো কিছুর অভাব বা টাকার প্রতি আলাদা মোহ আমার কখনো ছিল না। আমি সবসময় নিভৃতে, আড়ালে থেকে সাধারণ জীবনযাপন করতে ভালোবাসি। করপোরেট চাকরির জন্য যে ধরনের মনমানসিকতার প্রয়োজন, তা আমার একেবারেই নেই। পরিবেশ ও মানসিকতার মিল না থাকায় একের পর এক সুযোগ ছেড়েছি আমি।
তিনি যোগ করলেন, ‘আজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের পড়িয়ে আমি যে মানসিক প্রশান্তি পাই, তা বড় কোনো পদে কাজ করে পাওয়া সম্ভব নয়। কোমলমতি শিশুদের মাঝে মানসম্মত শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে পারা এবং তাদের মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করার মধ্যেই আমি সত্যিকারের আনন্দ খুঁজে পেয়েছি।’ পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছে, নায়লা ম্যাডাম তাদের অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে পড়ান। পড়া ভুল হলে বা না পারলে কখনোই রেগে যান না বা মারধর করেন না। বরং পরম মমতায় আবার বুঝিয়ে দেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লিলা রানী ভৌমিক জানালেন, ২০১৭ সালে এই বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করার পর থেকেই নায়লা সারাফ অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে শিশুদের শিক্ষা দিয়ে আসছেন। তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীল একজন শিক্ষক।



