রসায়নে নোবেল যৌথভাবে পেলেন ফরাসি ও জাপানি বিজ্ঞানী

বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করছে নোবেল কমিটি। ছবি : সংগৃহীত
কিছু অণু কী করে অভিন্ন না হয়েও পরস্পর প্রতিবিম্বের মতো অস্তিত্বশীল থাকে, সেই রহস্য উন্মোচনকারী দুই বিজ্ঞানী পেলেন এবারের রসায়নের নোবেল।
ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি কাগাঁও ও জাপানি বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াইকে ২০২৬ সালে রসায়নের পুরস্কারজয়ী হিসেবে আজ বুধবার ঘোষণা দিয়েছে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।
৯৬ বছর বয়সী অঁরি কাগাঁও ফ্রান্সের প্যারিস-জুড ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক। অন্যদিকে ৭৬ বছর বয়সী কেনসো সোয়াইও ইমেরিটাস অধ্যাপক, তবে জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সে।
আগামী ডিসেম্বরে তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। ১২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার পুরস্কারমূল্যে ভাগ করে নেবেন দুজন।
নোবেল কমিটি জানিয়েছে, অসমমিত জৈব সংশ্লেষণে ‘নন-লিনিয়ার প্রভাব ও অটোক্যাটালাইসিস’ আবিষ্কারের জন্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছে কাগাঁও ও সোয়াইকে।
তাদের গবেষণা জটিল ও অসমমিত অণু তৈরির পদ্ধতিকে এগিয়ে দিয়েছে। আধুনিক ওষুধ ও বিভিন্ন উপকরণ তৈরিতে এসব অণু গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একে যুগান্তকারী আবিষ্কার হিসেবে দেখছে নোবেল কমিটি।
জীবদেহে অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো কিছু অণু দুটি ভিন্ন রূপে থাকতে পারে। এই দুই রূপ একে অপরের আয়নার প্রতিবিম্বের মতো। কিন্তু জীবন্ত প্রাণীর শরীরে এই দুই রূপের মধ্যে সাধারণত একটিই দেখা যায়। কেন এমন হয়, তা দীর্ঘদিন ধরেই রসায়নবিদদের কাছে একটি রহস্য ছিল। এই রহস্যের সমাধানের পথই দেখিয়েছেন অঁরি কাগাঁও ও কেনসো সোয়াই।
জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যকে রসায়নবিদেরা হোমোকাইরালিটি বলেন। শব্দটি এসেছে ‘একই’ ও ‘হাত’ শব্দের গ্রিক ভাষার প্রতিশব্দ থেকে। মানুষের দুই হাত যেমন একে অপরের প্রতিবিম্ব, তেমনি অ্যামিনো অ্যাসিডেরও দুটি প্রতিবিম্ব রয়েছে। কিন্তু দেহকোষে তৈরি প্রোটিনে এই দুই রূপের মাত্র একটিই পাওয়া যায়। অন্য রূপটি প্রকৃতিতে অত্যন্ত বিরল।
দীর্ঘদিন ধরে রসায়নবিদেরা বোঝার চেষ্টা করেছেন, কীভাবে এই হোমোকাইরালিটি তৈরি হলো। এমন রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ে পরীক্ষাও করেছেন, যেগুলোতে দুটি আয়নার প্রতিবিম্বরূপ অণু তৈরি হতে পারে। কিন্তু পরীক্ষাগারে প্রতিবারই দুই রূপ প্রায় সমান পরিমাণে তৈরি হয়েছে।
সমস্যা হলো, রসায়নবিদেরা অনেক সময় এই দুই রূপের মধ্যে শুধু একটি তৈরি করতে চান। কারণ ওষুধ তৈরির মতো ক্ষেত্রে জীবন্ত শরীরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার সময় অণুর দুটি রূপের একটির কাঙ্ক্ষিত প্রভাব থাকতে পারে, অন্যটির নাও থাকতে পারে।
এবার রসায়নে নোবেল দেওয়া হয়েছে এমন আবিষ্কারের স্বীকৃতি হিসেবে, যা রসায়নবিদদের এমন রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দিয়েছে, যার মাধ্যমে হোমোকাইরালিটি তৈরি করা সম্ভব।
রসায়নে নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান হাইনার লিঙ্কে বলেন, ‘অঁরি কাগাঁও ও কেনসো সোয়াই এক শতাব্দীরও বেশি পু্রনো একটি রাসায়নিক রহস্যের সমাধান দিয়েছেন—কীভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হোমোকাইরালিটি তৈরি হতে পারে। তারা যে রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো তৈরি করেছেন, সেগুলো অসাধারণ।
১৯৮৬ সালে অঁরি কাগাঁ এই রহস্য সমাধানের পথে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। তিনি রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এর মাধ্যমে আগের পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে একটি নির্দিষ্ট আয়নার প্রতিবিম্বরূপ তৈরি করা সম্ভব হয়।
এরপর ১৯৯৫ সালে কেনসো সোয়াই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। ওই বছর প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে তিনি প্রথম এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার নকশা তুলে ধরেন, যেটিতে হোমোকাইরালিটি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
অবশেষে ২০০৩ সালে তিনি সফল হন। তিনি এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া দেখান, যেখানে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকা দুটি আয়নার প্রতিবিম্বরূপের মধ্যে মাত্র একটিই তৈরি হয়েছিল। জীবনের বাইরে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এর আগে কেউ এমন সাফল্য অর্জন করতে পারেননি।
অঁরি কাগাঁও ও কেনসো সোয়াইয়ের আবিষ্কারের ফলে এখন জানা গেছে, কীভাবে হোমোকাইরালিটি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ওষুধ তৈরির জন্য রাসায়নিক বিক্রিয়ার নকশা করেন যেসব রসায়নবিদ, তাদের জন্য এই আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



