সেই চোখ, সে চিৎকার এবং সে নীরবতা

নানা পাটেকর
মৃত্যু কখনোই সিনেমার মতো হয় না। সে জান্তব, আকস্মিক, অবশ্যাম্ভাবী আর সত্য। সিনেমায় নায়ক মরে, সংগীত ফুলেফেঁপে ওঠে, ক্যামেরা কেঁপে ওঠে কিংবা আকাশের দিকে তাকায়, আর পর্দা নেমে আসে কিংবা অন্ধকার হয়। বাস্তবে নানা পাটেকর মারা গেলেন ভোর ৫টা ২০ মিনিটে, গোয়ার মনিপাল হাসপাতালে হৃদযন্ত্র হঠাৎ থেমে গিয়ে। বয়স ৭৫। কোনো প্রস্তুতি ছিল না। কোনো ক্লাইম্যাক্স ছিল না। একটা হেডলাইন, আর তারপর সারা ভারত আর বাংলাদেশ জুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা— যেটা শুধু তখনই নামে, যখন এমন কেউ চলে যান, যাকে আমরা এতদিন ধরে প্রায় অক্ষয়/ অমর ভেবেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।
বিশ্বনাথ পাটেকর। মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার মুরুদ-জঞ্জিরায় জন্ম, ১ জানুয়ারি ১৯৫১। একটা মারাঠি পরিবারে। ছেলেবেলার সেই নামটাই আসল নাম ছিল; কিন্তু পরিবার আর বন্ধুরা তাকে ডাকত ‘নানা’ বলে। ডাকনামটা এতটাই গায়ে লেগে গেল যে সময়ের সঙ্গে তা সরকারি কাগজপত্র পর্যন্ত পৌঁছে গেল। পাসপোর্ট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সিনেমার পোস্টার— সব জায়গায় তিনি ‘নানা পাটেকর’। অথচ ভেতর থেকে যিনি ছিলেন, তিনি বিশ্বনাথ— মুরুদ-জঞ্জিরার সেই ছেলেটি, যার বাবার কাপড়ের ব্যবসা ভেঙে পড়েছিল, আর সংসারে পড়েছিল টান।
এখানেই শুরু। সিনেমার পর্দায় ওঠার অনেক আগে, মুম্বাইয়ের রাস্তায় নামতে হয়েছিল তাকে। সিনেমার পোস্টার আঁকতেন। রাস্তার জেব্রা ক্রসিং এ চুন মাখতেন, রঙ করতেন দেয়াল। এটা কোনো রূপকথার শুরু নয়— এটা ক্ষুধার, লজ্জার, আর একরকম জেদের শুরু। স্যার জে জে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড আর্ট থেকে ডিগ্রি নেওয়া সেই তরুণ কখনো ভাবেননি যে একদিন তাকে অভিনয়ের ইতিহাসে গুনে রাখা হবে তিনটি জাতীয় পুরস্কার, চারটি ফিল্মফেয়ার, দুটি মহারাষ্ট্র রাজ্য পুরস্কার আর ২০১৩ সালের পদ্মশ্রীর হিসাব দিয়ে।
আমার মতো কেউ কেউ কিন্তু হিসাব দিয়ে মনে রাখব না। আমরা তাকে মনে রাখব চোখ দিয়ে। সেই চোখ— যা হুমায়ূন ফরীদির মতো, যা এক সেকেন্ডে স্নেহ থেকে হত্যার ইচ্ছায় পৌঁছে যেতে পারত। যা তাকিয়ে থাকত একদম স্থির, প্রায় অভদ্রভাবে স্থির, যেন সে তোমার ভেতরটা পড়ে ফেলছে। অভিনেতা অনেকরকম হয়। কিন্তু কেউ কেউ ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে একটা আলাদা রকম শারীরিক ভয় তৈরি করতে পারেন— যেন ভদ্রতা আর সহিংসতা একই শরীরে বাসা বাঁধতে পারে, আর কোনটা কখন ফুটবে সেটা দর্শক জানবে না। নানা পাটেকরের পুরো কেরিয়ারটা ওই অনিশ্চয়তাময় দৃষ্টির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল বললে হয়তো ভুল বলা হবে না।
আমার প্রথম তার সিনেমা দেখার স্মৃতি— ‘পারিন্দা’। ১৯৮৯। বিদ্যাসাগরের সেই অন্ধকার, রক্তাক্ত মুম্বাইয়ের গল্পে পাটেকরের আনা চরিত্রটি ছিল এমন এক হিংস্র পশুর, যার মধ্যে অকারণে একটা কাব্যিকতা লুকিয়ে ছিল। সেরা সহঅভিনেতার জাতীয় পুরস্কার, সেরা সহঅভিনেতার ফিল্মফেয়ার— সব এলো ওই চরিত্রে অভিনয় করে, এটাই ছিল তার প্রথম জাতীয় পুরস্কার। এর আগে ‘অন্ধ যুদ্ধ’ (১৯৮৭) ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি প্রথমবার ফিল্মফেয়ার মনোনয়ন পেয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালে ‘মিমাগামান’ দিয়ে বলিউডে তার অভিষেক; তারপর ‘মাফিচা সাক্ষীদার’ (১৯৮৬) সহ একাধিক মারাঠি সিনেমাতে ছোট ছোট চরিত্র। ব্রিটিশ টিভি সিরিজ ‘লর্ড মাউন্টব্যাটেন: দ্য লাস্ট ভাইসরয়’-এ নাথুরাম গডসে চরিত্রে অভিনয়— এ কাজগুলো এখন প্রায় ভুলে যাওয়া, কিন্তু এগুলোই ছিল তার ভীত। আর ১৯৮৮ সালে মীরা নায়ারের ‘সালাম বম্বে!’ — অস্কার মনোনীত সেই ছবি, যা তাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিল, সালাম বম্বের সেই নানা পাটেকরকে কে ভুলতে পারে আর!
তারপর এলো ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ (১৯৯১)। শুধু পাটেকরের পরিচালনায় প্রথম ছবি নয়, এটা ছিল অভিনয়ের প্রতি তার বিশ্বাসের প্রমাণ। এ সিনেমার জন্য তিনি তিন বছরের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসার চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে তিনি সম্মানসূচক ‘ক্যাপ্টেন’ পদমর্যাদা পেয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয় ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের সময় তিনি মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টে মেজর হিসেবে সেবা দিয়েছিলেন। ১৯৮৮-তে তিনি টেরিটোরিয়াল আর্মিতে যোগ দেন এবং ২০১৩ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে অবসর নেন। ক্যামেরার সামনে যুদ্ধের অভিনয় আর সীমান্তে সত্যিকারের যুদ্ধ— দুই-ই করেছেন নানা পাটেকর। অভিনয়ের জন্য মানুষ এমন কাজ করে না; অভিনয়কে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য করতে হয় বলে মনে করতেন নানা।
‘অঙ্গার’ মুক্তি পায় ১৯৯২-তে, প্রথম সেরা খলনায়কের ফিল্মফেয়ার পান নানা পাটেকর। ‘রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান’-এ শাহরুখ খানের পাশে বসে তিনি দেখালেন, ভালো মানুষও কতটা ভয়ংকর হতে পারে। ‘তিরঙ্গা’য় রাজকুমারের পাশে। ‘ক্রান্তিবীর’ (১৯৯৪)— সেই জুয়াড়ি, ব্যর্থ, রাগী ছেলে, যার মুখে ইতিহাসের বাক্য যেন ফুটে উঠত স্বতঃস্ফূর্তভাবে; জাতীয় পুরস্কার, ফিল্মফেয়ার, স্ক্রিন— তিনটিই পেলেন সেবার একসঙ্গে।
তারপর ‘অগ্নিসাক্ষী’ (১৯৯৬)। নিষ্ঠুর স্বামী। দ্বিতীয় জাতীয় পুরস্কার। আর ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’— বধির বাবা, মণিষা কৈরালার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই লোকটি, যিনি কোনোদিন একটি শব্দও বলেন না, শুধু হাত নাড়েন, চোখ সরান, আর আপনার বুক ফেটে যায় পর্দার এপাড়ে। এর মাঝে ‘অভয়’ (১৯৯৪), ‘হাম দোনো’ (১৯৯৫), ‘গুলাম-এ-মুস্তফা’ (১৯৯৭), ‘যশবন্ত’ (১৯৯৭), ‘ওয়াজুদ’ (১৯৯৮), ‘কোহরাম’ (১৯৯৯)— অমিতাভ বচ্চনের পাশে। এ তালিকা যত লম্বা হয়, তত স্পষ্ট হয় একটা জিনিস: এ মানুষটি কখনো একই চরিত্র দুবার করেননি, আর অমিতাভ বচ্চনরাও মহানায়ক হয়ে উঠেছেন নানাদেরই ছোট ছোট অবদানে।
কেন এ লোকটিকে এতো ভালো লাগে? উত্তরটা সম্ভবত খুব সহজ এবং খুব অস্বস্তিকর; তিনি আমাদের মগজের চেনা মানুষগুলোকে অভিনয় করতেন। রাস্তার লোক, বাজারের লোক, বাড়ির লোক। ক্ষমতাহীন, ক্ষুব্ধ, ক্লান্ত। ‘অব তক ছাপ্পান্ন’-এর সদাশিব আমরে একজন এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট— যা নায়কত্বের ফ্রেমে বন্দি করার সহজ সুযোগ, কিন্তু পাটেকর সেখানে পুলিশি গর্বের বদলে দেখালেন ক্লান্তি; হত্যা যখন পেশা হয়ে যায়, তখন মানুষের চোখে কী জমে, তিনি দেখালেন। ‘অপহরণ’ (২০০৫)— দ্বিতীয় সেরা খলনায়ক ফিল্মফেয়ারে, আর স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডেও। ‘ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১’ (২০০৬)— ট্যাক্সি চালকের হাস্যরসের ভেতর একটা পুরনো ক্লান্তি, জন আব্রাহামের সঙ্গে যে রসায়ন, তা আজও টিকিট কাটার মতো। ‘শক্তি: দ্য পাওয়ার’ (২০০২)-এ অত্যন্ত হিংস্র বাবা— দ্বিতীয়বার সেরা খলনায়কের ফিল্মফেয়ার মনোনয়ন।
আর তারপর ‘ওয়েলকাম’ (২০০৭)। উদয় শেঠী। সেই বিখ্যাত সংলাপ, সেই হাসি, সেই বিরাট শরীরের হালকা মোচড়। অনেকে বলবেন এটা বাণিজ্যিক সিনেমা। আমি বলব, এটাই অভিনেতার পরীক্ষা— যিনি ট্র্যাজেডিতে যতটা সৎ, তিনি কমেডিতেও ততটা সৎ কি না। ‘রাজনীতি’ (২০১০)— রাজনীতির ভেতরের অন্ধকার, আর সেরা সহঅভিনেতার পঞ্চম মনোনয়ন। ‘পাঠশালা’ (২০১০)-য় স্কুলের হেডমাস্টার— আর সেই ছবির পুরো পারিশ্রমিক তিনি দান করে দিলেন পাঁচটি ভিন্ন দাতব্য সংস্থায়। এটা কোনো প্রচার ছিল না। স্বভাবই এমন ছিল।
এরপর? তিনি ফিরে গেলেন মাতৃভাষায় এবং সেখানেই এলো তার জীবনের সবচেয়ে বড় চরিত্রগুলোর একটি— ‘নাটসম্রাট’ (২০১৬)। গণপতরাও ‘আপ্পা’ বেলওয়ালকর, একজন অবসরপ্রাপ্ত নাট্য অভিনেতা, যিনি মঞ্চে ছিলেন রাজা, ঘরে ডুবে যাওয়া মানুষ। সেরা অভিনেতার ফিল্মফেয়ার মারাঠি পুরস্কার— একই পুরস্কার তিনি পেয়েছিলেন ‘ড. প্রকাশ বাবা আমতে— দ্য রিয়েল হিরো’ (২০১৪) ছবির জন্যও। ‘দ্য জঙ্গল বুক’-এর হিন্দি সংস্করণে শের খাঁ-কে কণ্ঠ দিলেন। ‘কালা’ (২০১৮) নামের তামিল ছবিতে রজনীকান্তের পাশে সেরা খলনায়কের পুরস্কার। ‘দ্য ভ্যাকসিন ওয়ার’ (২০২৩)— ছবিটা টিকল না, কিন্তু পাটেকরের অভিনয় টিকল। আর শেষে ‘হাউসফুল’ — দুর্বল ছবি, তবু যেটুকু সোনালি মুহূর্ত ছিল, তার বেশিরভাগই পাটেকরের।
কিন্তু এ লম্বা তালিকা তার আসল উত্তরাধিকার নয়। উত্তরাধিকার হলো সেই জীবন, যা তিনি বেঁচেছিলেন সিনেমার বাইরে। এত খ্যাতির পরেও আন্ধেরীতে এক বেডরুমের হল-কিচেনের ফ্ল্যাটে বসবাস। এক বেডরুমের ফ্ল্যাট। বলিউডের শীর্ষস্থানীয় অভিনেতার জন্য এ চিত্রটা মানায় না, কিন্তু নানা পাটেকরের জন্য একেবারে মানানসই। রান্না করতে ভালোবাসতেন। নিজে হাতে রান্না করতেন, বাড়িতে আসা বন্ধুদের জন্য, অতিথিদের জন্য বিশেষ ভোজের আয়োজন করতেন। সেই হাত, যা পর্দায় রিভলভার ধরত, সেটাই ঘরে মাখত মসলা। আর ভারতের চিজি সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে তা চোখে পড়তে আমাদেরও।
আর পাটেকর ছিলেন কৃষক। কৃষির সঙ্গে সম্পর্ক কখনো ছিন্ন করেননি, গোপন করেননি। পুনের কাছে তার কৃষিজমি ছিল, যেখানে তিনি ধান আর গম চাষ করতেন। আর এ চাষাবাদ থেকে যা আয় হতো, তার একটা বড় অংশ তিনি খরা-আক্রান্ত কৃষকদের সাহায্যে দান করতেন। ২০১৫ সালের আগস্টে বিদর্ভ অঞ্চলের ৬২টি কৃষক পরিবারকে ১৫ হাজার রুপির চেক দিয়েছিলেন। সেপ্টেম্বরে লাতুর ও ওসমানাবাদের মারাঠওয়াড়া অঞ্চলের আরও ১১৩টি পরিবারকে। যারা ঋণের চাপে আত্মহত্যা করেছেন, তাদের পরিবারের হাতে তিনি আর্থিক সহায়তা তুলে দিয়েছেন। রাজ কাপুর পুরস্কারের দশ লাখ টাকা— পুরোটাই মহারাষ্ট্রের খরা-ত্রাণে দান। আর ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে সহঅভিনেতা মকরন্দ আনাসপুরের সঙ্গে মিলে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’— যা মহারাষ্ট্রের সংকটে পড়া, ঋণগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক সহায়তা, সমর্থন এবং টেকসই সমাধান দেওয়ার কাজ করে। #IcareIsupport হ্যাশট্যাগ দিয়ে টুইটার ক্যাম্পেইন চালিয়ে খরা-ভুক্তদের জন্য অর্থ জোগাড় করেছেন। যিনি পর্দায় গ্যাংস্টার হয়েছেন, তিনি বাস্তবে দাঁড়িয়েছেন চাষির পাশে, এ বৈপরীত্যরই নাম কি নানা পাটেকর।
আর একটা জিনিস, যা হয়তো সবচেয়ে বেশি বলে দেয় তার সম্পর্কে: তিনি তার ছেলে মল্লার পাটেকরের জন্য তারকাখ্যাতি কখনো ব্যবহার করেননি। ছেলেকে চলচ্চিত্র জগতে প্রতিষ্ঠা করতে স্টার পাওয়ারের ব্যবহার তিনি স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছিলেন। শিল্পী নিজের যোগ্যতায় দাঁড়াবে— এ অহংকারই হয়তো তার সবচেয়ে বড় শালীনতা।
জীবনটা সহজ ছিল না। ১৯৭৮-এ নীলকান্তির সঙ্গে বিয়ে; দুই ছেলে দুর্বাশা আর মল্লার। দুর্বাশা মাত্র দুই বছর বয়সে অসুস্থ হয়ে চলে যায়। নানা ২৮ বছর বয়সে বাবাকে হারান হার্ট অ্যাটাকে। মা নির্মলা পাটেকর ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি ৯৯ বছর বয়সে মারা গেলেন— শেষ পর্যন্ত ছেলের সঙ্গেই ছিলেন। দুই ভাই— অশোক ও দিলীপ পাটেকর। পাটেকর ৫৬ বছর বয়সে ধূমপান ছাড়লেন। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বাবা নাটক ভালোবাসতেন, তাকে নাটক দেখতে উৎসাহ দিতেন— সেখান থেকেই অভিনয়ের প্রেম। বিজয়া মেহতা তার প্রথম নাটক পরিচালনা করেছিলেন।
আর আছে সেই অন্ধকার অধ্যায়টাও, যা সরিয়ে রাখা যাবে না, যেহেতু জীবনে আলোর ভালোর গল্পের পাশে মন্দ আর অন্ধকারও থাকে। ২০০৮ সালে তনুশ্রী দত্ত ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ ছবির সেটে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনেন নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে। সিন্টায় অভিযোগ দায়ের হয়, কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ২০১৩-তে আবার, ২০১৮-তে আবার। ২০১৮-এর অভিযোগেই বলিউডে ‘মি টু’ ঝড় ওঠে। ওশিওয়াড়া থানায় পাটেকর, কোরিওগ্রাফার গণেশ আচার্য, পরিচালক রাকেশ সারং এবং প্রযোজক সমী সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে এফআইআর হয়। ২০১৯-এর জুনে ওশিওয়াড়া পুলিশের বি-সামারি রিপোর্টে পাটেকরকে অভিযোগমুক্ত করা হয়— রিপোর্টে বলা হয়, অভিযোগটি ‘বিদ্বেষমূলক’ এবং ‘প্রতিশোধমূলক’ হতে পারে। তনুশ্রী দত্ত বলেছিলেন, তিনি বম্বে হাইকোর্টে যেতে পারেন। বিষয়টি এখানেই থেমে যায়, কিন্তু থামে না প্রশ্নটা। এই দুই সত্য পাশাপাশি রাখতে হয়— পর্দায় যিনি এত মানুষকে গড়েছিলেন, ব্যক্তিজীবনে ঠিক ততটাই মানুষ ছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন ইতিহাসে তো থাকবে!
তবু আজ মৃত্যুর ভোরে, আমার ভাবনার ঘুরে ঘুরে আসছে নানা পাটেকরের মুখ আর সিনেমার দৃশ্যগুলোই। সকাল সাড়ে ৫টার দিকে যা ঘটল, তা কোনো দৃশ্য নয়; তা শুধু একটা বন্ধ দরজা, একটা হাসপাতালের করিডোর, একটা সাদা চাদর। কিন্তু যারা তাকে দেখেছেন, তাদের কাছে তিনি এখনো চলছেন। ‘ক্রান্তিবীর’-এর সেই শেষ ভাষণ, যেখানে রাগ আর বেদনা একসঙ্গে গলায় জড়িয়ে যায়। ‘খামোশি’-র সেই নির্বাক বাবা, যিনি মেয়ের হাতে হাত রেখে চলে যান। ‘নাটসম্রাট’-এর সেই শেষ দৃশ্য, যেখানে মঞ্চ আর জীবন আর আলাদা করা যায় না। এ দৃশ্যগুলো কোনো ফিল্ম আর্কাইভে বন্দি নয়; এগুলো দ্রষ্টার ভেতরে বাস করে। এটাই হয়তো অভিনেতার অমরত্ব— ঠিক সেলুলয়েডে নয়, স্মৃতিতে।
অভিনেতা হিসেবে নানা পাটেকরের বিশেষত্ব কী ছিল, সেটা ব্যাখ্যা করার কথা ভাবতে গেলে আমি অসাড় হয়ে পড়ি। আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, তিনি অভিনয় না, তিনি দাবি করেছেন। পুরো শরীর দিয়ে, কণ্ঠ দিয়ে, নীরবতা দিয়ে, এমনকি বিরক্তিভরে— যেন ক্যামেরা তার কাছে অনুগ্রহ চাইছে, উল্টোটা নয়। ভারতীয় সিনেমায় ইরফান খানের সঙ্গে তিনিই একমাত্র অভিনেতা, যিনি সেরা অভিনেতা, সেরা সহঅভিনেতা এবং সেরা খলনায়ক— তিনটি ফিল্মফেয়ার বিভাগেই পুরস্কার পেয়েছেন। এই একটা বাক্যেই তার পরিধি হয়তো মেপে ফেলা যায়।
২০১৩ সালে প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে আগে তাকে পদ্মশ্রী প্রদান করা হয়— সিনেমা ও শিল্পে অবদানের জন্য। ভারতের সেসময়ের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর হাত থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনে তিনি সেই সম্মান গ্রহণ করেন। একই বছর মহারাষ্ট্র সরকার তাকে রাজ কাপুর বিশেষ অবদান পুরস্কার দেয়। জাতীয় পুরস্কার তিনটি — ‘পারিন্দা’ (১৯৮৯), ‘ক্রান্তিবীর’ (১৯৯৫), ‘অগ্নিসাক্ষী’ (১৯৯৭)। মহারাষ্ট্র রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার দুটি — ‘রঘু মাইনা’ (১৯৮৩) আর ‘গাড় জেজুরি জেজুরি’ (১৯৮৬)। বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন পুরস্কার ‘অব তক ছপ্পন’-এর জন্য, জি সিনে অ্যাওয়ার্ড ‘নাটসম্রাট’-এর জন্য, আনন্দ বিকাটন সিনেমা অ্যাওয়ার্ড ‘কালা’-র জন্য। এ তালিকা লম্বা, কিন্তু তালিকা কখনো বলে না সেই রাতগুলো, যখন তিনি নিজে রান্না করে বন্ধুদের খাওয়াতেন; বলে না সেই সকালগুলো, যখন তিনি পুনের জমিতে ধানের চারার বেড়ে ওঠা দেখতে যেতেন; বলে না সেই ভোরগুলোর কথা, যখন তিনি যুদ্ধাবস্তার কার্গিলের মাটিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
নানা পাটেকরের মৃত্যুর খবরে মহারাষ্ট্রের কৃষকরা কাঁদবেন, কারণ পাটেকর তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মুম্বাইয়ের আন্ধেরীর সেই এক বেডরুমের ফ্ল্যাটের সামনে ভীড় জমবে, কারণ তিনি সেখানেই থাকতেন— এত খ্যাতির পরেও। আর আমাদের মতো দর্শকরা সন্ধ্যায় হয়তো পুরনো ছবি চালাবেন, কারণ এটুকু ছাড়া আর কী উপায়? ‘অব তক ছাপ্পান’ চালাবেন, ‘পরিন্দা’ চালাবেন, ‘নাটসম্রাট’ চালাবেন আর বারবার একই কথা ভাববেন: এটা কী করে সম্ভব? একজন মানুষ কি করে একসঙ্গে এতটা ভয়ংকর আর এতটা কোমল হতে পারে?
নানা চলে গেলেন আজ ৮ অক্টোবর ২০২৬, ভোরের আলো ফোটার আগে। আর রেখে গেলেন এক বিশাল শূন্যতা, যা কোনো একক অভিনেতা পূরণ করতে পারবেন না, কারণ তিনি কোনো একক অভিনেতা ছিলেন না— তিনি ছিলেন একটা যুগ, একটা কণ্ঠস্বর, একটা রাগ, একটা ক্ষমা। বিশ্বনাথ পাটেকর ছিলেন আসল নাম। নানা পাটেকর ছিলেন অভিনয়ের নাম। আর এ দুজনের মাঝখানে বেঁচে ছিলেন এক ক্লান্ত, সাহসী, দোষী, দানশীল, সাধারণ মানুষ— যিনি কখনো ছোট ফ্ল্যাটে থেকেছেন, মাটি চষেছেন, জেব্রা ক্রসিং রঙ করেছেন, রান্না করেছেন, আর সিনেমার পর্দায় আমাদের সামনে আমাদের নিজেদের মুখ দেখিয়ে গেছেন।
সিনেমার পর্দা নেমেছে। বেজেছে এন্ডবেল। আলো জ্বালুন। নানা ইজ নো মোর। কিন্তু যতদিন কেউ ‘ক্রান্তিবীর’ দেখবে, যতদিন কেউ ‘নাটসম্রাট’-এর শেষ দৃশ্যে চোখ মুছবে, ততদিন ওই লোকটি হাসবেন, চিৎকার করবেন, অথবা শুধু চুপ করে তাকিয়ে থাকবেন— ঠিক যেভাবে শুধু নানা পাটেকর তাকাতে ‘পারতেন’।











