সেই ‘বিহারি বগা’র কাছে শেষ পর্যন্ত চেয়ার হারালেন ওসি রহিম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিভিন্ন অপরাধকর্মে জড়িত থাকায় যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে ওয়াকিল হোসেন বগাকে বহিষ্কার করে চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দল। সেই বগা এতই ক্ষমতাধর যে তাকে ধরার চেষ্টা করে ‘চেয়ার হারালেন’ নগরীর খুলশী থানার ওসি মোহাম্মদ আবদুর রহিম।
বগাকে ধরতে গতকাল মঙ্গলবার রাতে পুলিশ অভিযান চালায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের কার্যালয় অর্থাৎ নগর ভবনে। এ নিয়ে আজ দুপুরে ওসি রহিমকে ‘একহাত’ নেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। সন্ধ্যায় ওসিকে থানা থেকে সরিয়ে নেওয়ার আদেশ দিলেন সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী। যদিও আগের দিন থেকে ওসি রহিম ছুটিতে আছেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী, অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) ওয়াহিদুল হক চৌধুরীকে কয়েক দফা কল দিয়েও সাড়া মেলেনি। সিএমপির সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশিদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমি বিষয়টি শুনেছি। তবে অফিসিয়াল কোনো অর্ডার পাইনি।’ তবে নাম প্রকাশে অনাগ্রহী নগর পুলিশের এক উপকমিশনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সিএমপি কমিশনারের আদেশে এক মাস ১০ দিন আগে গত ২৩ আগস্ট খুলশী থানায় যোগ দেওয়া ওসি আব্দুর রহিমকে আবারও নগর বিশেষ শাখায় (সিটি এসবি) ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর আকবর শাহ থানার ওসি মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে খুলশী থানায় পদায়ন করা হয়েছে। একই আদেশে চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নাজের হোসেনকে আকবর শাহ থানার ওসি হিসেবে বদলি করা হয়েছে।
বদলি আদেশের বিষয়টি অবগত হয়েছেন বলে জানালেন খুলশী থানার ওসি আব্দুর রহিম। বললেন, ‘আমি কমিশনার স্যারের নির্বাহী আদেশে গত ৫ অক্টোবর রাত ১২টা থেকে ছুটিতে আছি। আমার ছুটি শেষ হবে ৮ অক্টোবর দুপুর ১২টায়। আমি কর্মস্থলে নেই। কোথাও কোনো অভিযানের বিষয়েও আমি অবগত ছিলাম না।’
ওয়াকিল হোসেন বগা (৪২)। যাকে ‘বিহারি বগা’ নামে চেনে সবাই। বাসা চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানার পাহাড়তলী ওয়ার্ডের ওয়্যারলেস কোলোনি এলাকায়। প্রায় ২০ মামলার আসামি। পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। গত ৮ জুন তাকে বহিষ্কার করে স্বেচ্ছাসেবক দল। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে তিনি নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
গত ২৯ আগস্ট নগরীর পাহাড়তলী কলেজের অস্থায়ী শিক্ষক মিজানুর রহমানকে তুলে নিয়ে মারধর করেন একদল সন্ত্রাসী। এ ঘটনায় ওয়াকিলকে আসামি করে মামলা হয় খুলশী থানায়। মামলা নেওয়ায় ওসি আবদুর রহিমকে ‘আওয়ামী লীগ’ আখ্যা দিয়ে ল্যাংটা করে ‘পেটানোর’ হুমকি দেন ওয়াকিল। ওসি থানায় জিডি করেন।
এর ভিত্তিতে গত ৪ সেপ্টেম্বর সকালে ওয়াকিলকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হয় পুলিশ। এতে ওসি রহিমসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন। ওসির সরকারি গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় ওয়াকিলকে প্রধান আসামি করে ১৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা করে।
পুলিশ ওয়াকিলকে গ্রেপ্তার করতে না পারলেও সেই ওসি রহিমের বিরুদ্ধেই তার বাবা আদালতে মামলা ঠুকে দেন। এতে অভিযোগ করা হয়, গত ৪ সেপ্টেম্বর ভোরে পুলিশসহ আসামিরা তাদের বাড়িতে বেআইনিভাবে প্রবেশ করে ভাঙচুর, লুটপাট ও পরিবারের সদস্যদের মারধর করে। এতে প্রায় ১৭ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। মামলা তদন্ত করছে সিআইডি।
এরপর গত ২৯ সেপ্টেম্বর নগরীর খুলশী থানার ওয়্যারলেস কোলোনি এলাকায় দুই কিশোর গ্যাং সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টার গ্রুপের বিরোধে মোহাম্মদ হৃদয় নামে ১৬ বছর বয়সী এক ছেলে খুন হন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাবার সঙ্গে সবজি বিক্রি করতেন হৃদয়। ফাইভ স্টার গ্রুপেরও সদস্য ছিলেন। অভিযোগ ওঠে, দুই গ্রুপের বিরোধ মেটাতে হৃদয়কে ডেকে নেওয়া হয়েছিল ওয়াকিলের অফিসে। সেখান থেকে বের হওয়ার পর তাকে নির্মমভাবে খুন করা হয়। সেভেন স্টার গ্রুপের নিয়ন্ত্রক ওয়াকিল বলে পুলিশ ও এলাকার লোকজন জানেন। এ ঘটনায় করা মামলায় ওয়াকিলকে আসামি করা হয়।
এরপর গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর পুলিশ তথ্য পায়, ওয়াকিল হোসেন বগা নগরীর টাইগারপাসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। পুলিশ সেখানে অবস্থান নিয়ে নগর ভবন ঘিরে রাখে। এসময় কার্যালয়ে ছিলেন মেয়র শাহাদাত। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সমালোচনার মুখে পড়েন মেয়র।
আজ বুধবার দুপুরে নগরীর ডবলমুরিং থানার ডিটি রোড এলাকায় মশক নিধন অনুষ্ঠানে যোগ দেন মেয়র। সেখানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে মেয়র শাহাদাত হোসেন সরাসরি ওয়াকিল হোসেন বগার পক্ষ নেন। ওসি আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ তোলেন তিনি।
মেয়র বললেন, ‘ওয়াকিল কোনো আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী নয়। সে গত ১৭-১৮ বছর ধরে আন্দোলন সংগ্রামে ছিল। জুলাই-আগস্টের একজন যোদ্ধাও সে। গত ১৬ বছরে তাকে প্রায় ৭০-৮০টা মামলা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। ওসি আব্দুর রহিম। সে আওয়ামী লীগের সময় বাকলিয়া থানার ওসি ছিল। বাকলিয়া থানার ওসি থাকা অবস্থায় যেখানে আওয়ামী লীগের সময় সে এনজয় করেছে। সে কীভাবে এখন বিএনপির আমলে ওসি হয়? সে খুলশী থানার ওসি হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের কোনো নেতা এরেস্ট হয় নাই। ছাত্রলীগ-যুবলীগের কোনো নেতা এরেস্ট হয় নাই।’
মেয়রের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি আব্দুর রহিম বললেন, ‘দুঃখজনক। আমি বাকলিয়ার ওসি থাকা অবস্থায় সম্পূর্ণ পেশাদারত্ব নিয়ে কাজ করেছি।’



