নতুন সাজে আঙ্কারা, বিলবোর্ডে ঢেকেছে জরাজীর্ণ বাড়ি

৭-৮ জুলাই তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত হবে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন—ছবি: রয়টার্স
আর মাত্র কয়েক দিন পরই শুরু হচ্ছে ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলন। বিশ্বের ৩২টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান যোগ দেবেন এই বৈঠকে। তাদের স্বাগত জানাতে যেন নতুন রূপে সেজে উঠেছে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা।
বিমানবন্দর থেকে শহরের কেন্দ্র পর্যন্ত পুরো সড়ক জুড়ে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। রাস্তার পাশে লাগানো হয়েছে নতুন ফুলের গাছ। বসানো হয়েছে বিশাল বিলবোর্ড। বিলবোর্ডের আড়ালে ঢেকে দেওয়া হয়েছে জরাজীর্ণ বাড়ি আর অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এলাকাগুলো। উদ্দেশ্য একটাই, বিদেশি অতিথিদের সামনে রাজধানীকে আরও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা।
এই সম্মেলনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের। তাই নিরাপত্তা ও সৌন্দর্যায়নে কোনো কমতি রাখতে চাইছে না তুরস্ক।
তবে সরকারের এই উদ্যোগে খুশি নন অনেক বাসিন্দা। বরং তাদের অভিযোগ, শহরকে সুন্দর দেখানোর চেষ্টায় সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
সম্মেলন চলাকালে রাজধানীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ থাকবে। নিরাপত্তার কারণে যান চলাচলেও থাকবে কড়াকড়ি। এতে দোকানপাট বন্ধ রাখতে হচ্ছে অনেক ব্যবসায়ীকে। মানুষের দৈনন্দিন চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।
কুর্দিপন্থী বিরোধী দল ডিইএম পার্টির সহসভাপতি তুনজের বাকিরহান বললেন, ‘আঙ্কারা এখন প্রায় উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। কয়েকটি সরকারি গাড়িবহর চলাচলের সুবিধার জন্য পুরো রাজধানী কার্যত থমকে গেছে।’
এমন গুঞ্জনও ছড়িয়েছিল যে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সকালে দৌড়াতে পারবেন বলে কয়েকটি পার্ক বন্ধ রাখা হবে। যদিও তুরস্কের কর্তৃপক্ষ এ দাবি অস্বীকার করেছে।
ব্যয় ২৩৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি
শুধু শহর সাজিয়েই থেমে থাকেনি সরকার। সম্মেলনের আগে সংস্কার করা হয়েছে একটি সামরিক বিমানবন্দর। তৈরি হয়েছে নতুন সড়ক। বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও হয়েছে।
তুর্কি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রস্তুতিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১ বিলিয়ন তুর্কি লিরা। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা। ডলারে এর মূল্য ২৩৫ মিলিয়নেরও বেশি।
সরকার বলছে, এসব কাজ শুধু সম্মেলনের জন্য নয়। ভবিষ্যতের জন্যও রাজধানীর অবকাঠামো উন্নয়নে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
ব্যবসায়ীদের কপালে দুশ্চিন্তা
তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। একটি মুদি দোকানের ব্যবস্থাপক উমিত অরকান বললেন, ‘এটা আমাদের টাকার অপচয়। এই অর্থ সাধারণ মানুষের জন্য ব্যয় করা হয়নি। বিলবোর্ডের আড়ালে লুকিয়ে রাখা দরিদ্র এলাকাগুলোর উন্নয়নেও নয়। সবকিছু করা হচ্ছে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য।’
তার দোকানের সামনে বিশাল বিলবোর্ড বসানো হয়েছে। ফলে ক্রেতারা দোকানটি দেখতে পাচ্ছেন না।
তিনি বললেন, ‘এক সপ্তাহ দোকান বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সাতজন কর্মচারীর বেতন দিতে হবে। দোকানভাড়া দিতে হবে। বীমার টাকাও দিতে হবে। কিন্তু ক্ষতির জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ নেই।’
একই অভিযোগ ফুল ব্যবসায়ী কাদির কোকুসেরও। তিনি জানালেন, আমাদের ব্যবসা পুরোপুরি নির্ভর করে মানুষের চোখে পড়ার ওপর। মানুষ গাছপালা দেখে থামে। কিন্তু বিলবোর্ড বসানোর পর বিক্রি ৯৫ শতাংশ কমে গেছে।
তার ভাষ্য, ‘কিছুই করার নেই। আরও ১০ দিন এভাবেই সহ্য করতে হবে।’
ট্যাক্সিচালকদের জন্য নতুন নির্দেশনা
বিদেশি অতিথিদের সামনে ভালো ভাবমূর্তি তুলে ধরতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে তুরস্কের ট্যাক্সিচালক ফেডারেশনও। সংস্থাটি চালকদের জন্য নতুন পোশাকবিধি ঘোষণা করেছে। ধূসর রঙের প্যান্ট ও সাদা শার্ট পরে দায়িত্ব পালনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া যাত্রীদের পানি, তুর্কি মিষ্টি ‘টার্কিশ ডিলাইট’ এবং কোলোন সুগন্ধি দিয়ে স্বাগত জানানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
ফেডারেশনের সভাপতি মেহমেত ইয়িগিনের বললেন, ‘এর মাধ্যমে তুরস্কের আতিথেয়তার সংস্কৃতি তুলে ধরা হবে।’
শহর জুড়ে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি
এই প্রথম আঙ্কারায় অশ্বারোহী পুলিশের বিশেষ ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে। রাস্তার গর্ত মেরামত করা হয়েছে। ফুটপাতের উঁচু-নিচু ম্যানহোলের ঢাকনাও সমান করা হয়েছে। সব মিলিয়ে রাজধানী যেন নতুন চেহারা পেয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা
সরকারের এই আয়োজন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে নানা রসিকতা। কেউ লিখেছেন, ‘এখন শুধু আঙ্কারায় সমুদ্র এনে দিলেই বাকি থাকবে না।’ আবার কেউ মজা করে বলেছেন, ‘এখন থেকে বিউটি পার্লারে ন্যাটো ট্রিটমেন্টও চালু হবে।’
আরেকটি মন্তব্যও বেশ ভাইরাল হয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘অতিথিকে অতিরিক্ত আপ্যায়ন করলে এখন মানুষ বলবে— তুমি বুঝি ন্যাটো আয়োজন করছ!’
শহর ছাড়ছেন অনেকে
সড়ক বন্ধ, যানজট আর গণপরিবহনে ভোগান্তির আশঙ্কায় অনেকেই সম্মেলনের আগেই আঙ্কারা ছেড়ে যাচ্ছেন। ফলে শহর ছেড়ে যাওয়া ট্রেন ও বিমানের টিকিট প্রায় শেষ হয়ে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা দেমির বালেমির বললেন, ‘আমি শহরে থাকছি না। অনেক জায়গা বন্ধ থাকবে। গণপরিবহনও ব্যাহত হবে।’ আরেক বাসিন্দা সিমার আক্ষেপ, ‘এই সাজসজ্জা আমাদের জন্য নয়।’
তিনি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি রসিকতার কথাও বলেছেন। ‘মাখোঁ যদি বাসে যাতায়াত করতেন, তাহলে হয়তো আমাদের বাসেও শেষ পর্যন্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বসত!’




