কিউবায় কি ‘মাদুরো মডেল’ প্রয়োগ করতে চাইছেন ট্রাম্প?

সংগৃহীত ছবি
কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ শুধু তিন দশক আগের একটি বিমান ভূপাতিতের ঘটনার বিচার নয়। বরং এটি হাভানার ওপর ওয়াশিংটনের নতুন চাপ কৌশলের অংশ কি না, সেই প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জন্ম দিয়েছে ব্যাপক আলোচনার। অভিযোগ প্রকাশের পর থেকেই কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে নতুন করে।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে অর্থনৈতিক চাপ, অবরোধ, রাজনৈতিক হুমকি ও সামরিক উপস্থিতির সমন্বিত কৌশল নিয়েছিল, কিউবার ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো একই পথ অনুসরণ করছে। তাদের মতে, রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই বৃহত্তর চাপ প্রয়োগেরই অংশ হতে পারে।
কী অভিযোগ রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে
বুধবার প্রকাশিত অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালে কিউবার উপকূলে দুটি মার্কিন বিমান ভূপাতিতের ঘটনায় রাউল কাস্ত্রো সরাসরি জড়িত ছিলেন। সে সময় তিনি কিউবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ অনুযায়ী, কাস্ত্রো ও তার পাঁচ সহযোগী মার্কিন নাগরিক হত্যা ষড়যন্ত্র, বিমান ধ্বংস এবং চারটি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। ওই ঘটনায় চারজন কিউবান-আমেরিকান নিহত হন।
মিয়ামিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভারপ্রাপ্ত মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ দাবি করেন, রাউল কাস্ত্রো এমন একটি ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছিলেন। যার ফলে কিউবার সামরিক বিমান বেসামরিক উড়োজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
১৯৯৬ সালে কী ঘটেছিল
১৯৯৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কিউবার যুদ্ধবিমান দুটি ছোট উড়োজাহাজ গুলি করে ভূপাতিত করে। বিমান দুটি পরিচালনা করছিল ‘ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ’ নামের একটি কিউবান-বিরোধী সংগঠন।
সংগঠনটির নেতৃত্বে ছিলেন সিআইএ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হোসে বাসুলতো। তাদের দাবি ছিল, তারা কিউবা থেকে পালিয়ে আসা ভিন্নমতাবলম্বীদের সহায়তা করত। তবে কিউবার অভিযোগ ছিল, সংগঠনটি কেবল মানবিক কাজ নয়, বরং সরকারবিরোধী গেরিলাদের অস্ত্র সরবরাহেও জড়িত ছিল। ঘটনার দুই দিন আগে সংগঠনটির সাবেক পাইলট হুয়ান পাবলো রোকে কিউবায় পালিয়ে গিয়ে দাবি করেন, ‘ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ’ কিউবায় অস্ত্র পাচারের সঙ্গে যুক্ত।
ওয়াশিংটনে কিউবার দূতাবাসের দাবি, ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে সংগঠনটির বিমান ২৫ বারের বেশি কিউবার আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছিল। বহুবার সতর্ক করার পরও যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা না নেওয়ায় কিউবা ‘নিজ সীমান্ত রক্ষায় বাধ্য হয়েছিল’।
কাস্ত্রো কি কখনো যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে যাবেন?
বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে রাউল কাস্ত্রোর যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে হাজির হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। বর্তমানে ৯৬ বছর বয়সী কাস্ত্রো কিউবার রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে কার্যকর প্রত্যর্পণ চুক্তিও নেই। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, কিউবার সরকার কখনোই একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিপ্লবী নেতাকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেবে না বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
কিউবার প্রতিক্রিয়া
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল অভিযোগটিকে ‘রাজনৈতিক কৌশল’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার ভাষ্য, এটি কিউবার বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনের পরিবেশ তৈরির অংশ। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, এই অভিযোগের কোনো আইনি ভিত্তি নেই বরং এটি কিউবান বিপ্লবের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের শত্রুতার বহিঃপ্রকাশ।
কিউবায় কি ‘রেজিম চেঞ্জ’ চায় যুক্তরাষ্ট্র?
বিশ্লেষকদের মতে, এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বহুবার প্রকাশ্যে কিউবার কমিউনিস্ট সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযানের পর ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, ‘এরপর কিউবার পালা।’
মার্কো রুবিওও ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় বলেছিলেন, ‘আমি যদি হাভানার সরকারে থাকতাম, তাহলে উদ্বিগ্ন হতাম।’
এরপর থেকেই কিউবার ওপর জ্বালানি অবরোধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামরিক হুমকি বাড়তে থাকে। বুধবারও ট্রাম্প অভিযোগ করেন, কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলের মাত্র ৯০ মাইল দূরে ‘বৈরী সামরিক ও গোয়েন্দা কার্যক্রম’ পরিচালনা করছে।
ড্রোন, যুদ্ধজাহাজ ও বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস দাবি করেছে, কিউবা গুয়ানতানামো বে ও ফ্লোরিডার কী ওয়েস্টে হামলার প্রস্তুতি হিসেবে ৩০০-র বেশি সামরিক ড্রোন সংগ্রহ করেছে বলে মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণা। যদিও কিউবা এই অভিযোগকে ‘সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরির চেষ্টা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস নিমিটজ ক্যারিবীয় অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। যুদ্ধবিমান বহনে সক্ষম এই রণতরীকে সামরিক হামলার সম্ভাব্য প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
সাংবাদিকরা ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, অভিযোগের পর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না। জবাবে তিনি বলেছেন, ‘আমি সেটা বলতে চাই না।’
নিউইয়র্ক সিটির লাতিন আমেরিকা বিষয়ক অধ্যাপক ড্যানিয়েল শ’র মতে, ‘২৪ ঘণ্টা আগের তুলনায় এখন কিউবায় হামলার সম্ভাবনা অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্র আইনি ও গণমাধ্যমভিত্তিক একটি বৈধতা তৈরি করার চেষ্টা করছে।’
মাদুরো মডেল কি কিউবায়ও?
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় যে কৌশল নিয়েছিল, কিউবার ক্ষেত্রেও তার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে।
ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ, সামরিক উপস্থিতি এবং অভিযোগপত্র প্রকাশের সমন্বিত চাপ তৈরি করেছিল। এরপর বিশেষ অভিযানে মাদুরোকে আটক করা হয়। যদিও কিউবার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, হাভানার সরকার এখনো ঐক্যবদ্ধ এবং রাউল কাস্ত্রোকে হস্তান্তরের কোনো ইঙ্গিত নেই।
উল্টো প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-কানেল সতর্ক করে বলেছেন, কিউবার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিলে তা ‘রক্তক্ষয়ী সংঘাতে’ রূপ নিতে পারে।
কিউবার কাছে আসলে কী চায় ওয়াশিংটন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবি, কিউবা যেন রাশিয়া, চীন, ইরান এবং ফিলিস্তিনপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। এছাড়া সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি থেকে বের হয়ে বাজারভিত্তিক ব্যবস্থায় যাওয়ার জন্যও চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র কিউবাকে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত দেখতে চায়।
মার্কো রুবিও বুধবার স্প্যানিশ ভাষায় দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় কিউবাকে ১০ কোটি ডলারের সহায়তার প্রস্তাব দেন। তবে একই সঙ্গে তিনি কিউবার সরকারকে বিদ্যুৎ, খাদ্য ও জ্বালানি সংকটের জন্য দায়ী করেন।
অন্যদিকে কিউবার দূতাবাস অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে অবরোধ দিয়ে কিউবাকে সংকটে ফেলছে, অন্যদিকে সেই সংকটের দায় কিউবার সরকারের ওপর চাপাচ্ছে।
সম্প্রতি কিউবা সফর করে ফেরা অধ্যাপক ড্যানিয়েল শ’ জানান, অবরোধের কারণে দেশটিতে খাদ্য সংকট, অপুষ্টি ও হতাশা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। তার মতে, এটি কিউবার জনগণের গলায় ‘ঔপনিবেশিক ফাঁস আরও শক্ত করে বাঁধার’ মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে।




