মরুভূমিতে চীনের রহস্যময় সামরিক স্থাপনা, যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেকাতে নতুন প্রস্তুতি?

সংগৃহীত ছবি
দূর থেকে দেখলে মনে হবে শুধুই এক বিশাল নীরব মরুভূমি। চারদিকে ধূসর বালু, পাথুরে ভূমি আর জনমানবহীন বিস্তীর্ণ এলাকা। দিনের বেলায় প্রচণ্ড তাপ, রাতে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা। স্বাভাবিক চোখে সেখানে বিশেষ কিছু চোখে পড়ে না। কিন্তু সেই নিস্তব্ধ মরুভূমির বুকেই ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে এমন এক সামরিক অবকাঠামো, যা বিশ্বশক্তির পারমাণবিক ভারসাম্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত মরুভূমিতে গড়ে উঠছে বিশাল সামরিক নেটওয়ার্ক। স্যাটেলাইট ছবিতে ধরা পড়েছে— পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো ঘিরে তৈরি হচ্ছে একের পর এক লঞ্চ প্যাড, শক্তিশালী বাংকার, যোগাযোগকেন্দ্র, রাস্তা এবং অন্যান্য সামরিক স্থাপনা।
মরুভূমির হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। এটি চীনের কৌশলগত পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল অবকাঠামোর উদ্দেশ্য হতে পারে চীনের পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা। বিশেষ করে কোনো প্রতিপক্ষ প্রথমে হামলা চালালেও যেন বেইজিং পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে— সেই লক্ষ্যেই এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলের হামি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষেত্রের কাছাকাছি ৮০টির বেশি নতুন লঞ্চ প্যাড তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে কয়েকটি অষ্টভুজ আকৃতির বড় সামরিক স্থাপনা, যেগুলোকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিস্তৃত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব স্থাপনা শুধু ক্ষেপণাস্ত্র রাখার জায়গা নয়; এগুলো ব্যবহার হতে পারে মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ, বিমান প্রতিরক্ষা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং সামরিক কমান্ড পরিচালনার কাজে।
চীনের দূরপাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে। তবে নতুন এই অবকাঠামো ইঙ্গিত দিচ্ছে, বেইজিং এখন শুধু আক্রমণ সক্ষমতা নয়, নিজের অস্ত্রভাণ্ডারকে সুরক্ষিত রাখার দিকেও করছে বড় বিনিয়োগ।
হাওয়াইভিত্তিক প্যাসিফিক ফোরাম থিংক ট্যাংকের গবেষক আলেকজান্ডার নিল বলেছেন, ‘মরুভূমির হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। এটি চীনের কৌশলগত পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।’
চীনের ঘোষিত পারমাণবিক নীতির অন্যতম ভিত্তি হলো ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ বা আগে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি। অর্থাৎ বেইজিং বলে আসছে, তারা কখনো প্রথমে পারমাণবিক হামলা চালাবে না। তবে যদি তাদের ওপর হামলা হয়, তাহলে পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন মরুভূমি নেটওয়ার্ক সেই দ্বিতীয় আঘাতের সক্ষমতা বা ‘সেকেন্ড স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি’ আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।
স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, হামি ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষেত্রের দক্ষিণ-পশ্চিমে দুটি বড় অষ্টভুজ আকৃতির স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। একটি সাইলো এলাকা থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দূরে, অন্যটি প্রায় ২৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চীনের পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির হাতে প্রায় এক হাজার পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে
এসব স্থাপনার আশপাশে রয়েছে সামরিক যান রাখার ব্যবস্থা, শক্তিশালী বাংকার, অস্ত্র সংরক্ষণ এলাকা, বিমানঘাঁটি ও রেল যোগাযোগ। সাম্প্রতিক ছবিতে সেখানে বড় সামরিক যান চলাচল এবং মহড়ার চিহ্নও দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মরুভূমির মধ্যে ছড়িয়ে থাকা কংক্রিটের প্যাডগুলোতে রাখা হতে পারে মোবাইল আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম), বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কিংবা উন্নত ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম।
ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের নিউক্লিয়ার ইনফরমেশন প্রজেক্টের পরিচালক হ্যান্স ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, ‘এসব স্থাপনার সঠিক ব্যবহার এখনো নিশ্চিত নয়। তবে এত বড় পরিসরের নির্মাণ দেখে কোনো সম্ভাবনাই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’
তার ভাষ্য, ‘আমি আগে কখনো এমন কিছু দেখিনি। এটি এক অসাধারণ প্রচেষ্টা।’
যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নজরে এখন চীনের দ্রুত বাড়তে থাকা পারমাণবিক সক্ষমতা। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের মূল্যায়ন অনুযায়ী, চীন দ্রুতগতিতে নিজের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিক করছে।
পেন্টাগনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চীনের পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির হাতে প্রায় এক হাজার পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি চীন উন্নত করছে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা। স্যাটেলাইটভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ দ্রুত শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে বেইজিং। এতে কোনো হামলার পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। তবে এই বিশাল অবকাঠামো ঘিরে এখনো অনেক রহস্য রয়ে গেছে।
চীন আসলে সেখানে কী ধরনের অস্ত্র মোতায়েন করবে? এসব স্থাপনা কি শুধুই প্রতিরক্ষার জন্য, নাকি আরও বড় কোনো সামরিক পরিকল্পনার অংশ—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও গোয়েন্দা-সংক্রান্ত বিষয় উল্লেখ করে সরাসরি মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক শক্তির প্রতিযোগিতায় চীন এখন নতুন অবস্থান তৈরি করছে। যদিও ওয়াশিংটন ও মস্কোর পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার এখনো বেইজিংয়ের তুলনায় অনেক বড়, তবে চীনের দ্রুত সম্প্রসারণ বিশ্ব নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে।
বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার এই সময়ে জিনজিয়াংয়ের সেই নীরব মরুভূমি হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক নজরদারির কেন্দ্রবিন্দু। যেখানে বাইরে থেকে দেখা যায় শুধু বালু আর পাথর কিন্তু সেই নির্জনতার আড়ালেই তৈরি হচ্ছে এমন এক সামরিক ব্যবস্থা, যা আগামী দিনের পারমাণবিক রাজনীতির হিসাব পাল্টে দিতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, পেন্টাগন, ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টস, কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস













