ইসরায়েল
‘গুলি করে কাঁদা’ নয়, এখন যেন ‘গুলি করে উল্লাস’

২০২৪ সালের ২৯ জুলাই আটক সেনাদের সমর্থনে স্দে তেইমান ঘাঁটির বাইরে বিক্ষোভে অংশ নিতে যাচ্ছেন ইসরায়েলি সেনারা। ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলকে নিয়ে একটি পরিচিত ধারণা ছিল, তারা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায় ঠিকই, কিন্তু সেটিকে অন্তত ‘দুঃখজনক প্রয়োজন’ হিসেবে তুলে ধরে। অর্থাৎ সহিংসতা চালালেও এক ধরনের অনুশোচনার ভাষা ব্যবহার করত। এই প্রবণতাকে পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা বলতেন ‘শুটিং অ্যান্ড ক্রাইং’—বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, ‘গুলি করা, আবার সেই গুলির জন্য কাঁদা’। কিন্তু গাজায় চলমান যুদ্ধের মধ্যে অনেক পর্যবেক্ষক বলছেন, সেই সময় এখন বদলে গেছে। এখন আর শুধু ‘গুলি করে কাঁদা’ নয়, বরং যেন ‘গুলি করে উল্লাস’ করার চিত্র দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও অমানবিক আচরণের অভিযোগ আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহু বছর ধরেই এমন অভিযোগ তুলে আসছে। তবে এবার যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তা হলো—নির্যাতনের সময় অনেক ইসরায়েলি সেনা বা কারারক্ষীর হাসাহাসি, বিদ্রূপ এবং প্রকাশ্য উল্লাস।
ফিলিস্তিনি বন্দিদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, নির্যাতনের সময় রক্ষীরা শুধু মারধরই করেনি, অনেক ক্ষেত্রে হাসতে হাসতে অপমানও করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতেও দেখা গেছে, ধ্বংস হওয়া বাড়িঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে সেনারা, আবার কোথাও ফিলিস্তিনিদের অপমান করে ভিডিও বানানো হচ্ছে।
এসব দৃশ্য অনেকের মনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে—সহিংসতা কি এখন শুধু সামরিক কৌশল নয়, বরং এক ধরনের সামাজিক স্বাভাবিকতা হয়ে উঠছে?
গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ভিডিও ও ছবি সামনে এসেছে। কোথাও পুরো একটি পাড়া ধ্বংস হয়ে গেছে, কোথাও শিশু নিহত হয়েছে, কোথাও আবার খাবার ও ওষুধের সংকটে সাধারণ মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। এসবের মাঝেও কিছু ইসরায়েলি সেনার আচরণ আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই সহিংসতার অনেক কিছুই এখন আর লুকানো হচ্ছে না। বরং কিছু ক্ষেত্রে নিজেরাই ভিডিও ধারণ করে প্রকাশ করা হচ্ছে। অর্থাৎ যারা এসব করছে, তারা ধরে নিচ্ছে যে তাদের সমাজের একটি অংশ অন্তত এসবকে সমর্থন করবে। এই বাস্তবতাকে অনেকে ইসরায়েলি সমাজের ভেতরের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
ইসরায়েলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা, যুদ্ধ এবং দখলদারিত্বের রাজনীতি বড় ভূমিকা পালন করেছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সামরিক উপস্থিতি, অবরোধ, অভিযান—এসব অনেকের কাছে ‘স্বাভাবিক নিরাপত্তা বাস্তবতা’ হয়ে গেছে। ফলে নতুন প্রজন্মের একটি অংশ সহিংসতাকে আর ব্যতিক্রমী কিছু হিসেবে দেখছে না বলেই মনে করছেন সমালোচকেরা।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গাজা যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের ভেতরে জাতীয়তাবাদী আবেগ অনেক বেড়েছে। হামাসের হামলার পর দেশটির জনগণের বড় অংশ নিরাপত্তা ও প্রতিশোধের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সেই পরিবেশে অনেক সময় মানবিক প্রশ্নগুলো আড়ালে পড়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এটাও সত্য, ইসরায়েলের সব মানুষ একইভাবে চিন্তা করেন না। দেশটির ভেতরেও যুদ্ধবিরোধী কণ্ঠ রয়েছে। অনেক মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও সাধারণ মানুষ ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের সমালোচনা করছেন। কেউ কেউ গাজায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যুকে ‘নৈতিক বিপর্যয়’ বলেও উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে ইসরায়েল সরকার বরাবরই দাবি করে আসছে, তারা আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করছে এবং হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। তাদের ভাষায়, গাজায় সামরিক অভিযান নিরাপত্তার প্রয়োজন থেকেই পরিচালিত হচ্ছে।
কিন্তু সমালোচকেরা বলছেন, আত্মরক্ষার যুক্তি থাকলেও বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, হাসপাতাল ধ্বংস, খাদ্য সংকট এবং বন্দিদের নির্যাতনের অভিযোগ কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। বিশেষ করে যখন এসব ঘটনার কিছু অংশ প্রকাশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন প্রশ্ন আরও জোরালো হয়।
এই পুরো পরিস্থিতি শুধু যুদ্ধ নয়, বরং সমাজের মানসিকতা নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। একটি সমাজ দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতের মধ্যে থাকলে সেখানে সহিংসতার প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যেতে পারে—এমন মতও দিয়েছেন অনেক সমাজবিজ্ঞানী।
গাজা যুদ্ধ সেই প্রশ্নটিকেই সামনে এনে দিয়েছে। সহিংসতা কি ধীরে ধীরে মানুষের কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে? যুদ্ধ কি শুধু শহর ধ্বংস করে, নাকি মানুষের ভেতরের মানবিক বোধও ক্ষয় করে দেয়?
‘গুলি করে কাঁদা’ থেকে ‘গুলি করে উদযাপন’—এই পরিবর্তনের আলোচনার ভেতরে মূলত সেই উদ্বেগই উঠে আসছে।
গাজা যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক সংঘাত নয়। এটি এখন নৈতিকতা, মানবাধিকার, দখলদারিত্ব এবং সমাজের মানসিকতা নিয়ে বৈশ্বিক বিতর্কেরও কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। আর সেই বিতর্কের মধ্যেই উঠে আসছে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি—সহিংসতা যদি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে মানবিকতার জায়গাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?
লেখক: ফিলিস্তিনি-কানাডীয় সমাজবিজ্ঞানী, লেখক ও নীতিবিশ্লেষক






