তছনছ একটি পরিবার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তছনছ হয়ে গেছে গুলশানের অভিজাত একটি পরিবার। যুক্তরাষ্ট্রফেরত ছেলে এখন চাঁদাবাজির মামলার আসামি হয়ে কারাবন্দি। আর মাকে করা হয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া থানার মানব পাচার মামলার আসামি। আদালতের নির্দেশে এই মামলার তদন্ত করছে পুলিশ।
প্রতারণা ও বলপ্রয়োগের আরেকটি মামলা করা হয়েছে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায়। পরিবারটিকে একের পর এক ‘সাজানো’ মামলার জালে ফাঁসানো হচ্ছে। সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন মা। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের সাবেক বিচারক মো. সানাউল্ল্যাহর (বর্তমান বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের উপসচিব) ক্ষমতার অপব্যবহার ও কুৎসিত প্রতিহিংসার শিকার হয়ে পরিবারটির সামনে এখন অমানিশার ঘোর অন্ধকার।
জানতে চাইলে মো. সানাউল্ল্যাহ বুধবার বিকালে মোবাইল ফোনে আগামীর সময়কে বললেন, ‘ব্যক্তিগত ঝামেলার ঘটনায় আমার লোক হিসেবে রুহুল আমিন আমার পক্ষে তার বিরুদ্ধে (নাসরিন) একটি মামলা করেছে। অন্য কোনো মামলার বিষয়ে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই। তার ছেলেকে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার করার পেছনে আমার হাত থাকার অভিযোগও মিথ্যা। কক্সবাজারে তার বিরুদ্ধে মানব পাচার মামলার বাদীকে আমি চিনি না। আদালতেও আমি কোনো প্রভাব খাটাইনি। কেউ অভিযোগ করলেই তা সত্য হয়ে যায় না।’
তবে নাসরিন আক্তারের ভাষ্য, ‘সমাজে আমার একটা পরিচয় আছে। আমি কোনোদিন উখিয়া যাইনি। আমার বিরুদ্ধে আদালতের আদেশে পুলিশ মানব পাচার মামলা রেকর্ড করল। এটি সানাউল্ল্যাহর কারসাজি। আমার ছেলেকেও তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্রদল করতেন, একজন মন্ত্রীর কাছের লোক, এই কথা বলে তিনি প্রভাব খাটিয়ে আমার পারিবারিক জীবনকে জাহান্নামে পরিণত করেছেন। এভাবে চলতে থাকলে আত্মহনন ছাড়া আমার কোনো উপায় নেই। আশা করি, মানবিক প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনার তদন্ত করে দ্রুত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।’
জানা গেছে, ১৬ বছর আগে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে সুখেই দিন কাটছিল রাজধানীর গুলশানের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী নাসরিন আক্তারের। বড় ছেলে নাহিদ খন্দকার যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা শেষ করেছেন। ২০২৩ সালে দেশে ফিরে তিনি মায়ের সঙ্গে যোগ দেন পারিবারিক ব্যবসায়। মেয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। আর ছোট ছেলে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল লেভেল শেষ করে যুক্তরাজ্যে পড়তে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমন একটি পরিবার এখন জ্বলছে অশান্তির অনলে। তাদের সময় কাটছে ভয় আর আতঙ্কে। দৌড়াতে হচ্ছে আদালত থেকে আদালতে।
নাসরিন আক্তার জানালেন, বিচারাধীন একটি মামলার সূত্র ধরে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের সাবেক বিচারক সানাউল্ল্যাহর সঙ্গে তার পরিচয়। এরপর পড়েন প্রতারণার ফাঁদে। গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর তাকে বিয়ে করেন সানাউল্ল্যাহ। এর পর থেকেই এলোমেলো হয়ে যায় নাসরিনের জীবন-সংসার। রেজিস্ট্রি কাবিননামায় সানাউল্ল্যাহ তার আগের স্ত্রী-সন্তান থাকার কথা গোপন করেন। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন অজুহাতে নাসরিনের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেন। এরই ধারাবাহিকতায় কিছুদিনের মধ্যেই তাকে ব্র্যান্ডেড গাড়ি ও জমি কিনে দিতে চাপ দেন। এ নিয়ে দাম্পত্য কলহ চরমে উঠলে তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন মামলা করেন নাসরিন আক্তার। তদন্ত শেষে পুলিশ সানাউল্ল্যাহকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেয়। কিন্তু আদালত চার্জ গঠন না করে মামলাটি খারিজ করে দেন। এর আগে নাসরিনকে তালাক দেন তিনি। তখন থেকেই তার কুৎসিত প্রতিহিংসার শিকার হয়ে নাসরিনের পুরো পরিবার এখন ঝুঁকিতে।
নাসরিন আগামীর সময়কে বললেন, গত মঙ্গলবার রাতে গুলশানে নিজস্ব গাড়ির শোরুমের সামনে থেকে ছেলে নাহিদ খন্দকারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রথমে পুলিশ জানায়, তার কাছে গাঁজা ও সিসা খাওয়ার সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি পুলিশকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং তার ছেলের ডোপ টেস্টের দাবি জানান। পরে পুলিশ চিত্রনাট্যের পরিবর্তন করে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায়। বুধবার আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাৃগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। নাসরিন আক্তারের অভিযোগ, সানাউল্ল্যাহ তার ঘনিষ্ঠ এক বিচারকের মাধ্যমে চাপ দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটকে এই আদেশ দিতে বাধ্য করেছেন। গুলশান থানার অফিসার ইনচার্জ দাউদ হোসেন মঙ্গলবার রাতে আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘নাহিদ খন্দকারকে নেশাদ্রব্যসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার কাছে গাঁজা ও সিসার সরঞ্জাম পাওয়া গেছে।’ অথচ বুধবার সকালে তার বিরুদ্ধে মাদকের কোনো মামলা দেওয়া হয়নি। চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। এ বিষয়ে জানতে বুধবার বিকালে একাধিকবার গুলশান জোনের ডিসি ও গুলশান থানার ওসিকে কল করা হলে তারা কেউই রিসিভ করেননি।
এদিকে, গত ১৬ জুন কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ও মানব পাচার অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানব পাচারের অভিযোগে মামলার আবেদন করেন স্থানীয় হারবাং ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. হানিফ। আবেদনটি আমলে নিয়ে সরাসরি উখিয়া থানাকে এফআইআর রেকর্ডের আদেশ দেন বিচারক। এই মামলায় এক নম্বর আসামি করা হয়েছে নাসরিন আক্তারকে। অন্য দুই আসামি হলেন খুলনার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মাসুদ ও উখিয়ার বাসিন্দা মনি আলম। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার অনুরোধে গুলশান থানা পুলিশ আসামির নাম-ঠিকানা যাচাই করতে গেলে নাসরিন আক্তার এই মামলার কথা জানতে পারেন। নাসরিনের অভিযোগ, এই গায়েবি মামলার পেছনেও সানাউল্ল্যাহর হাত রয়েছে।
মামলার এজাহারে বাদী মো. হানিফ যে মোবাইল নম্বর দিয়েছেন, সেই নম্বরে বুধবার সন্ধ্যায় কল করেন এই প্রতিবেদক। এক নারী রিসিভ করে ‘এটা হানিফের নম্বর না’ বলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর একাধিকবার কল করা হলেও তিনি আর রিসিভ করেননি। এ ছাড়া সানাউল্ল্যাহ তার ঘনিষ্ঠ রুহুল আমিন নামে এক ব্যক্তিকে দিয়ে নাসরিনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা (সি আর মামলা নং ৭৩৬/২৬) করেছেন। মামলার আবেদনে বলা হয়েছে, সানাউল্ল্যাহকে ফাঁদে ফেলে জোরপূর্বক বিয়ে করেন আসামি। এরপর মিথ্যা যৌতুক দাবি ও মারধরের মামলা করে তার মানহানি করছেন। আদালতের নির্দেশে মামলাটি এখন উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ তদন্ত করছে।
জানতে চাইলে মামলার বাদী রুহুল আমিনের ভাষ্য, ‘এখন সানাউল্ল্যাহর সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। আমি এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চাই না।’




