কমছে পানি, এবার টিকে থাকার লড়াই
- চট্টগ্রামে ভেঙেছে ৫৮২ গ্রামীণ সড়ক
- মেরামতে আনুমানিক খরচ ১৮০ কোটি টাকা
- বাঁচার আকুতি রাজারহাটবাসীর
- সাড়ে ৫ কোটি টাকা দেবে যুক্তরাজ্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নেমে যাচ্ছে বন্যার পানি। জেগে উঠছে ক্ষতচিহ্ন। কোনো এলাকায় ভেঙে গেছে সড়ক-মহাসড়ক। কোথাও পচে গন্ধ ছড়াচ্ছে স্বপ্নের ফসল ও ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র। যার বাড়িঘর ভেসে গেছে, তার ভেসে উঠেছে ভিটা। এভাবে বানে যেন পচে-গলে স্রোতের সঙ্গে অজানা গন্তব্যে চলে গেছে সাত জেলার অধিকাংশ এলাকার ‘দেহের মাংস’, রইল শুধু কঙ্কালসার দেহখানা। এই চিত্র চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবানসহ সব বন্যাদুর্গত এলাকার। এখন চলছে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম। শিগগির শুরু হতে পারে পুনরায় গড়ার কাজও।
চট্টগ্রামে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে গ্রামীণ সড়কের। প্রায় ৯ দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলা এবং মহানগরের বিভিন্ন স্থানে বন্যা দেখা দেয়। সবচেয়ে বেশি সময় ধরে বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে ছিল সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, আনোয়ারা ও লোহাগাড়া উপজেলা। এ ছাড়া উত্তর চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ, হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি বন্যায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
গ্রামীণ সড়কের দেখভাল করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বন্যার পানি নামার পর থেকে তারা বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিচ্ছেন। গতকাল বুধবার পর্যন্ত ৫৮২টি সড়ক ভেঙে যাওয়ার তথ্য তাদের কাছে এসেছে। এসব সড়কের মোট ৩৯১ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত। কোনোটির কার্পেটিং উঠে গেছে, কোনোটি মাঝখানে ভেঙে গেছে। আবার কোনোটির সিমেন্টের ঢালাই তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া কোনো কোনো কাঁচা সড়ক একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মাঝে মাঝে ভেঙেছে বেশিরভাগ সড়ক।
এলজিইডি চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন আগামীর সময়কে জানালেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের এই সংখ্যা আরও কিছুটা বাড়বে। সন্দ্বীপ, হাটহাজারীসহ কয়েকটি উপজেলার সড়ক এখনো জোয়ার কিংবা বন্যার পানির নিচে।
উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দের তথ্য, এখনো পুরোপুরি জরিপ শেষ হয়নি। আরও বাড়বে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের সংখ্যা। এখন পর্যন্ত আনুমানিক ১৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি।
‘প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতি ১৮০ কোটি টাকার মতো নির্ধারণ করা হয়েছে। সব হিসাব পাওয়া গেছে, এটি আরও বাড়বে। এরই মধ্যে মেরামতকাজ শুরু হয়েছে। যেসব সড়ক পুরোপুরি বন্ধ, সেগুলো চালু করা প্রথম লক্ষ্য’— জানালেন নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন।
আবারও লঘুচাপ, উপকূলে বাড়বে বৃষ্টিপাত: উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তর ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলীয় এলাকায় আবারও তৈরি হয়েছে একটি লঘুচাপ। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এটি আরও ঘনীভূত হতে পারে। এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে এবং বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় কিছুটা বাড়তে পারে বৃষ্টির পরিমাণ।
‘আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে স্থলভাগে উঠে আসতে পারে লঘুচাপটি। এতে উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়তে পারে বৃষ্টিপাত। তবে কয়েকদিন আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে ২৫০ থেকে ৩০০ মিলিমিটারের কাছাকাছি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছিল, এবার তেমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম’— তথ্য দিলেন আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির।
কক্সবাজারে ৮৯০ কোটি টাকার ক্ষতি: কক্সবাজারে টানা ৯ দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জেলার জনজীবন। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক সমন্বিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জেলার ১০টি উপজেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি পরিবার এবং ২৪ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছেন। প্রাথমিক হিসাবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা। মাঠপর্যায়ের বিস্তারিত যাচাই শেষে আরও বাড়তে পারে এই ক্ষতির পরিমাণ।
শুধু ত্রাণ নয়, প্রয়োজন টেকসই পুনর্বাসন: আইনজীবী মীর মোশারফ হোসেন টিটু বলেছেন, তাৎক্ষণিক ত্রাণ কার্যক্রম জরুরি হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া কাটবে না এ সংকট। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, কৃষকদের বীজ ও সার, মাছচাষিদের পোনা ও খাদ্য, স্বল্পসুদে ঋণ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও বাঁধ সংস্কার, নদী-খাল পুনঃখনন এবং পাহাড় সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
নাফে সৃষ্টি, নাফে বিনাশ: জীবন-জীবিকার তাগিদে নাফ নদের কূল ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল শত শত ঘরবাড়ি, দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ এক ছোট্ট জেলেপল্লী, নাম তার জালিয়াপাড়া। টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপে অবস্থিত এই পল্লীটি পরিণত হয়েছে এক ‘মরা পল্লীতে’। প্রায় দেড়শ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যে আবহমান বাংলার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ছিল জালিয়াপাড়া। শাহপরীর দ্বীপের জেলেপল্লীতে গত দুই যুগ আগেও প্রায় সাড়ে তিনশ পরিবারের বসতি ছিল। নাফের তীরে উত্তর-দক্ষিণে সারি সারি ছোট ঝুপড়ি ঘরগুলোতে ছিল সাত হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। আশা জাগানিয়া নাফের তীরে আরও শতবছর টিকে থাকার স্বপ্ন নিয়ে যে পরিবারগুলো মাথা গুঁজিয়ে ছিলেন, সেই নাফ নদই এই অভাগা মানুষগুলোকে করেছে নিঃস্ব। ধুয়েমুছে সব নিয়ে গেছে নদীভাঙন ও বন্যা।
বাঁচার আকুতি রাজারহাটবাসীর: কুড়িগ্রামের রাজারহাটের একটি দুর্গম চর হলো চর বিদ্যানন্দ। এটি উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের তিস্তা নদীতীরবর্তী একটি চর। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হলেও তারা অন্যান্য এলাকার মতো প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পান না। নদীবেষ্টিত এই এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় কেউ রাখে না তাদের নিয়মিত খোঁজ। ভারত থেকে আসা ঢল এবং ভারী বৃষ্টিতে নদীর পাড় ধস ও ক্ষয়ের শিকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে এই চরের প্রায় ৬ হাজার মানুষ। গত দুই সপ্তাহে পশ্চিম চর বিদ্যানন্দ এলাকায় অন্তত ২৫টি বসতবাড়ি নদীতে ভেসে গেছে। ঝুঁকিতে রয়েছে মণ্ডলপাড়া জামে মসজিদ ও পূর্ব চর বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এতে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী শত শত মানুষ।
হাতিয়ায় জাগছে ভগ্নদশা: বন্যায় তলিয়ে গিয়েছিল নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া। তিন দিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে পানি। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসছে কৃষি ও মৎস্য খাতের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। একই সঙ্গে ঘরবাড়ি, গ্রামীণ সড়ক এবং ব্রিজ-কালভার্টেরও ক্ষতিসাধন হয়েছে। এরই মধ্যে উত্তর পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে নতুন করে লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ায় এ অঞ্চলের সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
৫.৭ কোটি টাকা সহায়তা দেবে যুক্তরাজ্য: বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫৫ হাজারের বেশি মানুষকে ৩৫৫ হাজার পাউন্ড বা ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। গতকাল ঢাকার ব্রিটিশ হাইকমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে এ তথ্য।
প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা




