বিয়েতে মন নেই চিনাদের
১৮ বছরের রেকর্ড ভেঙে তলানিতে বিবাহের হার
- বিয়ে থেকে মুখ ফেরাচ্ছেন তরুণ প্রজন্ম, কমছে জন্মহারও, চিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

একসময় জনসংখ্যার বিপুল আয়তন ছিল চিনের অন্যতম শক্তি। সেই ছবিই এখন ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। বিয়ে করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন দেশটির নাগরিকদের একাংশ। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সংসার পাতার প্রবণতা কমছে। কেউ বিয়ে পিছিয়ে দিচ্ছেন, কেউ আবার একাই জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের বিবাহের পরিসংখ্যানে। ২০২৬ সালের প্রথম ন’মাসে চিনে বিয়ের নিবন্ধন নেমে এসেছে গত ১৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। শুধু সামাজিক পরিবর্তন নয়, এই প্রবণতা নিয়ে চিন্তিত দেশের প্রশাসনও। কারণ, বিয়ের সংখ্যা কমার সঙ্গে সন্তান জন্মের হার এবং ভবিষ্যতের জনসংখ্যার হিসাবও জড়িয়ে রয়েছে।
চিনের বেসামরিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইকাই’ জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটিতে মোট ৪৬ লক্ষ ৫০ হাজার যুগল বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। একই সময়ে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেছেন ২০ লক্ষ ৮০ হাজার যুগল। ২০০৮ সালের পর বছরের প্রথম ন’মাসে এত কম বিয়ের ঘটনা দেখা যায়নি। ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, চিনের তরুণ প্রজন্ম কি ক্রমশ বিয়ে ও পরিবার গঠনের ধারণা থেকেই দূরে সরে যাচ্ছে?
এর পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। চিনের বড় শহরগুলিতে বাড়িভাড়া ও বাড়ি কেনার খরচ অনেকটাই বেশি। পাশাপাশি সন্তানকে বড় করে তোলার ব্যয়, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচও সাধারণ পরিবারের কাছে বড় বোঝা হয়ে উঠেছে। কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক তরুণ-তরুণী বিয়ে বা সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বিষয়টিও তাঁদের কাছে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে গত কয়েক বছরে নানা পদক্ষেপ করেছে চিনা সরকার। সন্তান জন্মে উৎসাহ দিতে পরিবারগুলিকে আর্থিক সহায়তা, শিশুদের লালন-পালনে ভর্তুকি এবং প্রসব সংক্রান্ত চিকিৎসার খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সাল থেকে যোগ্য পরিবারগুলিকে প্রতি শিশুর জন্য বছরে ৩৬০০ ইউয়ান পর্যন্ত ভাতা দেওয়ার কর্মসূচিও চালু হয়েছে। আবাসন, স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা এবং নগর পরিকল্পনায় তরুণ পরিবারগুলির সুবিধার কথা মাথায় রেখে একাধিক উদ্যোগের কথা জানিয়েছে প্রশাসন। বিয়ের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করতেও নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
কিন্তু সরকারি উদ্যোগে এখনও পরিস্থিতি বদলায়নি। বরং চিনের জনসংখ্যার কাঠামোয় বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। শিশুদের তুলনায় প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ফলে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে শিল্প, উৎপাদন, শ্রমবাজার এবং দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায়।
চিনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে জন্ম নিয়েছে মাত্র ৭৯ লক্ষ ২০ হাজার শিশু। জন্মহার নেমে এসেছে প্রতি হাজারে ৫.৬৩-তে। একই বছরে টানা চতুর্থবারের মতো কমেছে দেশের মোট জনসংখ্যা। অর্থাৎ, বিয়ের প্রতি অনীহার পাশাপাশি জন্মসংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতাও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। জাতিসংঘের পূর্বাভাসও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।



