উৎসবের বদলে শ্মশানের নীরবতা, ঘরহারা বেত্রাবতীতে শুধু অপেক্ষা

ছবি: রয়টার্স
ঘর নেই। স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। কোথায় যাবেন, কোথায় রাত কাটাবেন তারও উত্তর নেই। তবু অপেক্ষা আছে। হয়তো কোনও একদিন প্রিয় মানুষটি ফিরে আসবেন। নেপালের নুয়াকোটের বেত্রাবতীতে ভয়াবহ বন্যার পর বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর দিন কাটছে এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই। কারও শরীর এখনও কাদা বালিতে ঢাকা। এমনকি কারও পরনে বদলানোর মতো পোশাকটুকুও নেই। মাথার ওপর ছাদ নেই, ঘরে মজুত খাবার নেই। আছে শুধু হারিয়ে যাওয়া আপনজনের খোঁজ আর আগামীকাল কোথায় রাত কাটবে সেই দুশ্চিন্তা।
২৭ আগস্ট সন্ধ্যায় বেত্রাবতীতে পৌঁছে দেখা যায়, বন্যায় ঘরছাড়া মানুষ তখনও আশ্রয়ের সন্ধানে। ইন্দ্রমায়া দাঙ্গোল বলছিলেন, আগের দিন তারা কেরাঘারিতে গিয়ে রাত কাটিয়েছিলেন, সেদিনও সেখানেই ফিরতে হবে। সন্ধ্যা নামতেই ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল বেত্রাবতী থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার পথ পেরিয়ে কেরাঘারির উদ্দেশে রওনা হয়।
দাঙ্গোল সম্প্রদায়ের বেত্রাবতীতে একসময় একশোর বেশি পরিবার ছিল। ২৬ আগস্ট বন্যার দিন প্রায় ৫০ জন কেরাঘারিতে গিয়ে রাত কাটান। পরদিন সংখ্যাটি কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩০। কেউ কাঠমান্ডুর দিকে, কেউ বিদুরের দিকে চলে গিয়েছেন। যাঁদের যাওয়ার আর কোথাও নেই, তারা খোলা আকাশের নিচেই রাত কাটাচ্ছেন।
ইন্দ্রমায়ার সবচেয়ে বড় চিন্তা অবশ্য তার ছেলে। বন্যায় গুরুতর আহত ছেলেকে উদ্ধার করে কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনদিন ধরে তিনি শুনছেন যে ছেলে ট্রমা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন।
কিন্তু ফোনে যোগাযোগ করতে পারছেন না তিনি। ছেলের সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করা ছাড়া তার হাতে আর কিছু নেই।
নারায়ণলাল দাঙ্গোলের কথায়, বেত্রাবতীতে একশোর বেশি পরিবার ছিল। এখন যাদের দেখা যাচ্ছে, তারাই অবশিষ্ট। কেউ কেউ এখনও জঙ্গলে আটকে আছেন বলে খবর আসে, কিন্তু তাদের কাছে এখনও উদ্ধারকারী দল পৌঁছতে পারেনি। অনেকেই ভেসে গিয়েছেন।
২৬ আগস্ট বন্যার দিন বেত্রাবতীতে গাই যাত্রা ও জনাই পূর্ণিমা ঘিরে বড় উৎসবের প্রস্তুতি চলছিল। হওয়ার কথা ছিল বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। অথচ সেই উৎসবের জায়গাই এখন শ্মশানের মতো। যোগেশ দাঙ্গোল জানালেন, তারা এখন এক গ্রামবাসীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
কিন্তু আশ্রয় মিললেও আতঙ্ক কাটেনি। চোখ বন্ধ করলেই বন্যার ভয়াবহ সেই দুর্বিষহ স্মৃতি ফিরে আসে। এক বাসিন্দার কথায়, কীভাবে তিনি পালিয়ে বেঁচেছেন, কীভাবে সেখানে পৌঁছেছেন তাই তার মনে নেই। আতঙ্কে এখনও ঠিকমতো হাঁটতেও পারছেন না।
সেখানকার এক বাসিন্দা সুনা তামাং সকাল ও সন্ধ্যায় ঘরছাড়া মানুষদের খাবার দিচ্ছেন। প্রথম দিন ৫০ থেকে ৬০ জন ছিলেন। রান্নার গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ার পর তিনি কাঠের আগুনে রান্না করছেন। তার কথায়, বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর চোখে এখনও জল।
বন্যায় সবকিছু চাপা পড়ে যাওয়ায় নিজেদের খাবারের মজুতও নেই কারও। নারায়ণলাল বলেন, ঘরই যখন নেই, খাবার কোথা থেকে থাকবে? এখন তাদের জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ প্রয়োজন। রাত হলে সুনা তামাংয়ের বাড়ির উঠোনেই আশ্রয় নিচ্ছেন ঘরহারা মানুষ। কিন্তু আগামীকাল কোথায় যাবেন, কোথায় থাকবেন কেউ জানেন না। ইন্দ্রমায়ার প্রশ্ন, ঘরহারা মানুষদের কি সরকার এবার দেখবে? কারণ বেত্রাবতীতে তখনও নেপাল সরকারের দেখা মেলেনি।







