মিৎসোনে বাঁধ কি মিয়ানমারের নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি

কাচিন রাজ্যের রাজধানীর প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে মালি ও এন’মাই নদীর মিলনস্থলে বাঁধটি নির্মাণের পরিকল্পনা
সম্প্রতি চীন সফরের সময় মিয়ানমারের জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং বহুদিন ধরে স্থগিত থাকা মিৎসোনে বাঁধ প্রকল্প পুনরায় চালুর বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন বলে জানা গেছে। অনেকের কাছে এটি কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; বরং জনমতের কোনো অর্থবহ পরামর্শ ছাড়াই, গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত মিয়ানমারে সবচেয়ে বিতর্কিত প্রকল্পগুলোর একটির প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত।
বছরের পর বছর ধরে মিৎসোনে বাঁধের বিরোধিতা মূলত এর পরিবেশগত, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদ, পূর্বপুরুষদের ভূমি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা এবং ইরাবতী নদীর উৎসস্থলের স্থায়ী পরিবর্তন। এসব উদ্বেগ এখনো বহাল রয়েছে। তবে এর পাশাপাশি প্রকল্পটির জাতীয় নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌমত্বের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কাচিন রাজ্যের রাজধানী মিতকিনার প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে, মালি ও এন’মাই নদীর মিলনস্থলে এই বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি তৈরি করা হলেও উৎপাদিত বিদ্যুতের বেশিরভাগই চীনে রপ্তানির কথা রয়েছে। ২০১১ সালে দেশজুড়ে নজিরবিহীন জনবিক্ষোভের মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন প্রকল্পটি স্থগিত করেছিলেন।
বাঁধটির অবস্থান বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ এটি মিয়ানমারের অন্যতম সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা সাগাইং ফল্টের কাছাকাছি। আধুনিক প্রকৌশল প্রযুক্তি কিছু ঝুঁকি কমাতে পারলেও বড় ধরনের ভূমিকম্পের বিরুদ্ধে কোনো বাঁধই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। এত বড় জলাধার পূর্ণ হওয়ার পর যদি ভয়াবহ কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে ভাটির দিকে বসবাসকারী লাখো মানুষের জন্য তা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ফলে এটি শুধু পরিবেশগত নয়, দীর্ঘমেয়াদি জননিরাপত্তার বিষয়ও।
শারীরিক ঝুঁকির পাশাপাশি প্রকল্পটির কৌশলগত গুরুত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সিঙ্গাপুরের আয়তনের কাছাকাছি বিস্তৃত হতে পারে এমন একটি জলাধার রক্ষায় কঠোর নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রিত প্রবেশব্যবস্থার প্রয়োজন হবে। মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এ থেকেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, বিনিয়োগ সুরক্ষার অজুহাতে চীন দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে, যা দেশটিতে বেইজিংয়ের কৌশলগত প্রভাব আরও বাড়াবে।
বিশ্লেষকদের মতে, পুনরায় চালু হলে মিৎসোনে বাঁধ প্রকল্প কেবল একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হবে না; এটি মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সক্ষমতারও একটি বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে।






