ইউএসএইডের অর্থায়ন বন্ধ
এইচআইভি সচেতনতাকর্মী থেকে যৌনকর্মী রুবি

আপাতত তার প্রতিটি রাত কাটে শুধু পরদিন পর্যন্ত টিকে থাকার মতো অর্থ জোগাড়ের আশায়- এপি
মধ্য নেপালের একটি ম্লান আলোয় ঢাকা মহাসড়কের পাশে প্রতি রাতেই দাঁড়িয়ে থাকেন রুবি লামা। অপেক্ষা করেন খদ্দেরের। মাত্র এক বছর আগেও ২৮ বছর বয়সী এই ট্রান্সজেন্ডার নারী একই এলাকায় রাত কাটাতেন ভিন্ন এক দায়িত্বে। তিনি ছিলেন এইচআইভি সচেতনতাকর্মী। যৌনকর্মীদের পরামর্শ দিতেন, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম বিতরণ করতেন এবং এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধে কাজ করতেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তা বন্ধ হয়ে চাকরি হারানোর পর এখন তাকেই জীবিকার জন্য সেই যৌনকর্মীদের কাতারে দাঁড়াতে হচ্ছে, যাদের একসময় তিনি সহায়তা করতেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ২০২৫ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএইড) কার্যত বিলুপ্ত করার পর নেপালে হাজারো সহায়তাকর্মীর মতো রুবি লামাও চাকরি হারান। নেপাল এনজিও ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, এতে দেশটিতে প্রায় ৩৫ হাজার সহায়তাকর্মী কর্মহীন হয়েছেন। আর বিশ্বজুড়ে চাকরি হারিয়েছেন ২ লাখ ৮১ হাজারের বেশি মানুষ, যাদের অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে নেপালের ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর ওপর। বিভিন্ন অধিকার সংগঠনের হিসাবে, এইচআইভি-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি হারানো ট্রান্সজেন্ডার কর্মীদের ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশ জীবিকার তাগিদে যৌনকর্মে যুক্ত হয়েছেন। বৈষম্যের কারণে তাদের জন্য অন্য চাকরি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ তাদের অনেকেই বছরের পর বছর এইচআইভি প্রতিরোধ, ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে পরামর্শ দেওয়া এবং নিরাপদ যৌন আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির কাজ করেছেন।
রুবি লামা টানা ৯ বছর কাজ করেছেন ‘ফ্রেন্ডস হেটাউডা’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। ব্লু ডায়মন্ড সোসাইটির মাধ্যমে ইউএসএইডের সহায়তায় পরিচালিত এই সংস্থা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য এইচআইভি পরীক্ষা, পরামর্শ এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যবহৃত সরঞ্জাম সরবরাহ করত। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি অধিকাংশ কর্মীকে ছাঁটাই করে এবং অনেক সেবা স্থগিত করে।
ব্লু ডায়মন্ড সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, অর্থায়ন বন্ধ হওয়ার ফলে তাদের এক হাজার ২০০ জনের বেশি সেবাগ্রহীতা প্রেপ ওষুধ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। একই সঙ্গে ৩৫০ জন কর্মীর মধ্যে ২৬২ জন চাকরি হারিয়েছেন। নেপালের জাতীয় এইডস ও যৌনবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র সতর্ক করে জানিয়েছে, এইচআইভি পরীক্ষা কমে যাওয়া, চিকিৎসা ব্যাহত হওয়া এবং প্রতিরোধমূলক উপকরণের সংকট দেশটির দীর্ঘদিনের অর্জনকে পিছিয়ে দিতে পারে।
চাকরি হারানোর পর অনেক সাবেক স্বাস্থ্যকর্মী চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পড়েছেন। রুবি লামা বলেছেন, তিনি শুরুতে অন্য চাকরির চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ট্রান্সজেন্ডার হওয়ার কারণে বারবার প্রত্যাখ্যাত হন। এমনকি এক নিয়োগদাতা চাকরির বিনিময়ে তার কাছে যৌন সুবিধা দাবি করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ভাড়া ও খাবারের খরচ জোগাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত যৌনকর্মই তার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়।
এ পথে ঝুঁকিও কম নয়। সাবেক সচেতনতাকর্মীরা জানিয়েছেন, তাদের অনেকেই শারীরিক আক্রমণ, ধর্ষণ, পুলিশের হয়রানি এবং খদ্দেরদের নিরাপত্তাহীন যৌন সম্পর্কের চাপের মুখে পড়ছেন। কেউ কেউ যৌনবাহিত সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন। আবার অনেকে প্রতিরোধমূলক ওষুধের সুবিধা হারিয়ে এইচআইভিতে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এর প্রভাব শুধু নেপালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাদের মতে, এইচআইভি কোনো সীমান্ত মানে না, বিশেষ করে এমন একটি দেশে যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে শ্রমের জন্য যান এবং ভারতের সঙ্গে উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে। জাতিসংঘের এইডস কর্মসূচি ইউএনএইডস জানিয়েছে, সহায়তা কমে যাওয়ায় বিভিন্ন দেশে এইচআইভি পরীক্ষা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে অনেক অঞ্চলে কন্ডোম সরবরাহের অর্থায়নও ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
তবে ঝুঁকি জেনেও অনেক সাবেক সহায়তাকর্মী বলছেন, তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। রুবি লামার কাছেও প্রতি রাতে মহাসড়কের পাশে ফিরে যাওয়া কোনো পছন্দের বিষয় নয়, বরং বেঁচে থাকার তাগিদ। তিনি জানান, একসময় যে কাজে তিনি মানুষের জীবন রক্ষার চেষ্টা করতেন, সেই কাজে আবার ফিরতে চান। কিন্তু আপাতত তার প্রতিটি রাত কাটে শুধু পরদিন পর্যন্ত টিকে থাকার মতো অর্থ জোগাড়ের আশায়।




