শোকের সময় নেই নেপালের সুদীপের

নেপালের পাহাড়ের ঢালে ঢালে শোনা যাচ্ছে মানুষের কান্না!
নেপালের ভয়াবহ বন্যার ১০ দিন পার হলেও জনজীবন এখনো স্বাভাবিক ছন্দে ফেরেনি। চারদিকে ধ্বংসের চিহ্ন। পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আপনজন হারানোর কান্না। উত্তরগয়ার সুদীপও হারিয়েছেন তার পরিবারের সদস্য। তবে এখন শোক করার সময় নেই তার। চোখের পানি মুছে ছুটছেন উদ্ধার অভিযানে— যদি আর কারও স্বজনকে ফিরিয়ে আনতে পারেন, যদি কাউকে এই দুঃসহ সময়ে একটু আরাম দিতে পারেন।
রসুয়ার উত্তরগয়ার দুই ভাই সুদীপ আর প্রদীপ। সুদীপের বয়স ৩১, প্রদীপের ২৭। তারা শুধু ভাই না, বন্ধুও। চাচা-চাচি অনেক কষ্টে মানুষ করেছেন তাদের। জেলা প্রশাসন অফিসে চাকরি করতেন সুদীপের চাচা। মধ্যবিত্ত সংসারে ছিল খাবারের টান, পরনের কাপড় ছিল মলিন, তাও দুই ভাইকে পড়াশোনা শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করতে চেয়েছিলেন চাচা-চাচি। তাদের সে আশা পূরণও হয়েছিল। সুদীপ চাকরি করতেন উত্তরগয়া মিউনিসিপালটিতে। চতুর্থ শ্রেণির কর্মকর্তা তিনি। প্রদীপ ছিলেন সপ্তম শ্রেণির পাবলিক হেলথ অফিসার। ভবিষ্যতের সুদিনের স্বপ্ন দেখছিল পুরো পরিবার। তবে সে সুখ সইল না তাদের।
স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২৬ আগস্ট সকালে চাচার ফোন এলো সুদীপের কাছে। ‘বাবা বন্যা আসছে। সাবধানে থেক।’ এই খবরে দিশাহারা সুদীপ সঙ্গে সঙ্গেই জানালেন প্রদীপকে। দুই ভাই ঠিক করলেন রাসুয়াবাসীকে এই দুর্যোগের মধ্যে ফেলে তারা বসে থাকতে পারেন না। শুধু সরকারি কর্মচারী বলে নয়, মানুষ হিসেবে তাদের দায়িত্ব সবাইকে বন্যার খবর জানানো। স্বাস্থ্যকর্মী মনিরামকে নিয়ে প্রদীপ সবাইকে বন্যার কথা জানাতে বের হয়ে যান। অন্যদিকে, সুদীপ ‘জনক দাই’ নামে গ্রামীণ পৌরসভার তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে আরেকটি মোটরসাইকেলে সামনে এগিয়ে যান।
মোটরসাইকেল নিয়ে এগিয়ে গেলে পেছন থেকে চিৎকার করে প্রদীপ বলতে থাকেন, ‘ভাই মাইকিং শুরু করো।’ প্রদীপের কথা শুনে সুদীপ হাতে মাইক নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বন্যার সতর্কবার্তা দিতে থাকেন। খালতে বসতিতে পৌঁছে তিনি ভাইকে আর সামনে না আসতে বলেন। ভাইয়ের পরামর্শ মেনে প্রদীপ খালতেই থেমে যান। তবে সুদীপ ও আইটি কর্মকর্তা জনক নতুন সেতুর কাছে পৌঁছে যান।
নতুন সেতুটি পার হওয়ার সময় তাদের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রধান বলরাম নেউপানের দেখা হয়। বলরাম তখন দ্রুত ফিরে আসছিলেন এবং চিৎকার করে বলছিলেন, ‘বন্ধু, তুমি বাঁচবে না, তুমি বাঁচবে না! এখনই মারা যাবে। চলো ফিরে যাই, ফিরে যাই!’
তারা সঙ্গে সঙ্গে মোটরসাইকেল ঘুরিয়ে ফিরে যেতে শুরু করেন। কিন্তু পথে একপাল মহিষের কারণে তাদের প্রায় ২ সেকেন্ডের জন্য থামতে হয়।
ওই ২ সেকেন্ডের দেরিই তাদের জন্য ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়। খালতে গ্রামের দিকে যাওয়া ছোট সড়কটিতে পৌঁছাতেই পেছন থেকে বিশাল এক ঢেউ তাদের আঘাত করে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়ংকর ছিল, কিছু বোঝার বা ভাবার সুযোগই কারও ছিল না।
সেই বন্যার ভয়াবহ রূপ মনে পড়লে এখনো সুদীপের মুখ কেঁপে ওঠে। তার মতে, এটি শুধু বন্যা না, এটি কোনো সাধারণ ঢেউও না। যেন একটা ক্ষেপণাস্ত্র, যা মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। চোখের পলক ফেলারও সময় পায়নি কেউ।
ঢেউ আঘাতের পর জনক স্রোতে ভেসে যান। সুদীপ অল্পের জন্য বাঁচলেও ভাই প্রদীপকে হারান। ২৭ বছর বয়সী প্রদীপ স্বপ্ন আর নিজের হাতে গড়া ঘর রেখে চিরতরে চলে যান।
ভাইকে হারিয়ে দুদিন নিস্তব্ধ হয়ে ছিলেন সুদীপ। পুরো পৃথিবী যেন থমকে গিয়েছিল। কিন্তু ওই যে, পাহাড়ের ঢালে ঢালে শোনা যাচ্ছে মানুষের কান্না! আর কীভাবে বসে থাকবেন সুদীপ কুমার নিউপেন! চোখের পানি মুছে তাই ছুটেছেন উদ্ধার অভিযানে। হয়তো কারও ভাই আটকে আছে কোথাও, কেউ হয়তো সব হারিয়ে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। মাত্র ২ সেকেন্ডের জন্য বেঁচেছে যে প্রাণ, তার প্রতিদান দিতে তাই মাঠে নেমেছেন সুদীপ।





