৫ বছরের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি মিয়ানমার জান্তার

ভিয়েতনাম-মিয়ানমার বিজনেস ফোরামে বক্তব্য দিচ্ছেন মিন অং হ্লাইং। ছবি: রয়টার্স
সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতায়, তারপর নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মিয়ানমারে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে নতুন একটি শান্তি উপদেষ্টা কমিটিও গঠন করেছেন তিনি। কমিটিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল থেইন সেইনের আমলের শান্তি উদ্যোগে যারা যুক্ত ছিলেন তাদেরই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই কমিটির প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সাবেক মন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) অং মিন।
দ্য ইরবাতীর প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৭ আগস্ট গঠিত এই উপদেষ্টা কমিটির কাজ হবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়ার প্র্যায়ের নেতৃত্বাধীন জান্তার ‘জাতীয় সংহতি ও শান্তি আলোচনা কমিটি’কে (এনএসপিসি) পরামর্শ দেওয়া। পাঁচ সদস্যের এই উপদেষ্টা দলে রয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্টের দপ্তরবিষয়কমন্ত্রী অং মিন, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী থেইন জাও, অং নাইং উ, ড. মিন জাও উ এবং থেত নাইং।’
থেইন সেইনের মেয়াদে ‘মিয়ানমার পিস সেন্টার’ (এমপিসি)-এর অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব ছিলেন অং মিন। আর অং নাইং উ এবং ড. মিন জাও উ-ও ছিলেন সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। অন্যদিকে সাবেক মন্ত্রী থেইন জাও পূর্বে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ‘জাতীয় জাতিগোষ্ঠীবিষয়ক এবং অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি’র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আফিম সম্রাট নামে পরিচিত লো হ্সিং হানের নিকটাত্মীয় থেত নাইংও আগের শান্তি কমিটিগুলোতে যুক্ত ছিলেন। উত্তর মিয়ানমারভিত্তিক জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী, বিশেষ করে ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে জানা যায়।
এইচলা মং শোয়ে এবং সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল খিন জাও উ’র মতো এমপিসির অন্য অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরেই জান্তা পরিচালিত শান্তি কমিটিগুলোতে যুক্ত রয়েছেন। তবে অং মিনের দল এই প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে মিন অং হ্লাইংয়ের কমিটিতে যোগ দিল। উল্লেখ্য, তহবিল ব্যবহারে স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে একসময় কঠোর আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে এমপিসি।
এই নতুন উপদেষ্টা দলের মূল দায়িত্ব হবে এনএসপিসিকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া, মিয়ানমার জুড়ে যুদ্ধবিরতি চুক্তি (এনসিএ) বাস্তবায়নে বাস্তবসম্মত প্রস্তাব উপস্থাপন করা, শান্তিপ্রক্রিয়ায় কারা অংশ নেবেন তা নির্ধারণ করা এবং বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংস্থা, সুশীলসমাজ, বিশেষজ্ঞসহ দেশি-বিদেশি শান্তি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করা। দলটির প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও সম্মানী দেওয়া হবে ‘জাতীয় সংহতি ও শান্তি বাস্তবায়ন বিভাগ’-এর বাজেট থেকে।
বিশ্লেষকদের মতে, অং মিনের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি তৈরির পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো জান্তার চিরচেনা ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির অংশ হিসেবে বিদ্রোহীদের মধ্যে ফাটল ধরানো।
একদিকে তথাকথিত শান্তির বার্তা দিলেও, জান্তা বাহিনী তাদের বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। এমনকি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিরোধ ঘাঁটিগুলোতেও বোমাবর্ষণ থামায়নি। উত্তর শান রাজ্যে চীন-মধ্যস্থতাকৃত যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি এখনো বেশ নড়বড়ে। উত্তর শান রাজ্যের এই আপেক্ষিক শান্ত পরিবেশের সুযোগ নিয়ে জান্তা বাহিনী সম্প্রতি রাখাইনে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে বিমান ও স্থল অভিযান আরও জোরদার করেছে।
জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে শান্তি আলোচনার জন্য আহ্বান জানালেও, পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেসকে (পিডিএফ) আত্মসমর্পণ করার জন্য ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে জান্তা।
২০২১ সালের সেনা অভ্যুত্থানের পর এনসিএতে স্বাক্ষরকারী দলগুলোসহ অনেক জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনই চুক্তিটিকে বাতিল বলে ঘোষণা করেছে। কিন্তু জান্তা এখনো এনসিএ কাঠামোর অধীনেই শান্তি বজায় রাখার বিষয়ে জোর দিচ্ছে। ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবর ৮টি জাতিগত সশস্ত্র দল মিলে প্রথম এই এনসিএ চুক্তিতে সই করে। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরও দুটি দল এতে যোগ দিলে মোট স্বাক্ষরকারী দলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০টিতে।



